

মাত্র সাত বছর বয়সে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবল ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ থেকে খেলার প্রস্তাব পান। ক্ষুদে তরুণ যেনো বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। ছেলেকে ফুটবলার বানাতে মা করেছেন পরিষ্কারকর্মীর কাজ, বাবা ছিলেন ফেরিওয়ালা। বাবা-মায়ের কষ্ট বৃথা যায়নি। তাদের কষ্ট সার্থক করে, স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিয়ে সেই ক্ষুদে ছেলে এখন ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা আশরাফ হাকিমি।ছোট দলের বড় তারকা তিনি। বিশ্বকাপে প্রথমবার সুপার এইটে উঠেছে আটলাস সিংহরা। বাছাইপর্ব থেকে এই দীর্ঘ যাত্রায় দলের অন্যতম কান্ডারী ছিলেন আশরাফ।স্পেনেই জন্ম, সেখানেই বেড়ে উঠা; তবে, মাঠ মাতিয়েছেন মরক্কোর হয়ে। মাদ্রিদে জন্মালেও তার শরীরে বইছে মরক্কোর রক্ত। ১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর স্পেনের মাদ্রিদে জন্ম মরক্কোর বংশোদ্ভূত আশরাফ হাকিমির। দারিদ্রতার সাথে লড়াই করে কোনোরকমে বেঁচে ছিল তার পরিবার।অল্প বয়সেই ফুটবল পায়ে প্রতিভা দেখাতে সক্ষম হন তিনি। বাবা-মায়ের ইচ্ছা ছিল হাকিমি একদিন স্পেনের জার্সি গায়ে মাঠে মাতাবে; খেলবে জাতীয় দলের হয়ে। মাত্র ৭ বছর বয়সেই রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন ক্ষুদে হাকিমি। প্রথমবার চিঠি পাবার পর বিশ্বাসই করতে পারেনি এতো বড় ক্লাব তাকে নিতে চায়। বয়সভিত্তিক দলগুলোতে পায়ের জাদুতে দ্যুতি ছড়িয়ে উঠে আসেন সিনিয়র দলে।২০১৬ সালে রিয়াল মাদ্রিদ একাডেমিতে যোগ দেন হাকিমি। এক বছর পরেই ২০১৭ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে মাদ্রিদের সিনিয়র টিমে জায়গা করে নেন। স্বপ্নপূরণের পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে যান হাকিমি।মাদ্রিদের জার্সিতে এক বছর মাঠ মাতিয়ে ধারে খেলতে যান জার্মান ক্লাব বরুশিয়া ডর্টমুন্ড। সেখান থেকে পাড়ি দেন ইতালিয়ান ক্লাব ইন্টার মিলানে। দাপট দেখিয়েই পিএসজিতে ডাক পান মাত্র এক বছরের মাথায়।হাকিমির ঠিকানা হয়তো স্পেনেই হতো। কিন্তু ভাগ্য তাকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যায় বংশের কাছে। স্পেন থেকে শুরু করে ফ্রান্স, বেলজিয়াম সহ ইউরোপ জুড়ে থাকা মরোক্কান অভিবাসীদের মাঝ থেকে প্রতিভাবান ফুটবলার খুঁজে বের করতে নির্দেশ দেওয়া হলো।মরোক্কান ফুটবল ফেডারেশনের নিয়োগ দেওয়া স্কাউট টিমের চোখেই ধরা পড়ে হাকিমির প্রতিভা। ফুটবলের প্রতি তার এতোটাই আসক্তি ছিলো যে, দল পেলেই হবে, সেটা স্পেন না মরক্কো এ নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না।ছোটবেলা থেকেই বাবার সাথে টিভিতে মরক্কোর খেলা দেখতেন। খেলোয়াড়দের জানাশোনাও ছিলো বাবার মাধ্যমেই। মরক্কোর খাবার, সংস্কৃতি সবকিছুই টানতো হাকিমিকে। তাই দুই দেশের মাঝে একটিকে বেছে নিতে খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হয়নি তাকে।তার করা গোলেই কাতার বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে স্প্যানিশদের। শেষ ষোলোতে পেনাল্টি শ্যুটআউটে শেষ গোল করে উল্লাসে মাতেন হাকিমি।গ্যালারি জুড়ে মরক্কোর সমর্থকদের উল্লাস জানান দিচ্ছিলো ইতিহাস গড়েছে তারা। এরপরই সেই দৃশ্য; যে দৃশ্য এখন ভাইরাল নেট দুনিয়ায়। যে দৃশ্য হৃদয় ছুঁয়েছে কোটি কোটি ফুটবল ভক্তের। ছবিতে দেখা যায় মা সাইদা মৌ, হাকিমির গালে চুমু খাচ্ছেন। বিপরীতে হাকিমিও চুমু খাচ্ছেন মায়ের কপালে। এই দৃশ্য অবশ্য এবারই প্রথম নয়। এর আগে বেলজিয়ামের বিপক্ষেও মরক্কোর ঐতিহাসিক জয়ের পর দেখা গিয়েছিল একই চিত্র।মরক্কোর নাম নিলেই এখন চলে আসে হাকিমির নাম। ছোট দেশের এই বড় তারকা মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই পেয়েছেন। দারিদ্রতাকে হার মানিয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করে তিনি এখন বিশ্বের কাছে বড় এক উদাহরণ।


