রেফারির হুইসেল বাজতেই কান্নারত অবস্থায় ড্রেসিং রুমের টানেল ধরে হাঁটা ধরলেন। বিশ্বমঞ্চে মাঠ থেকে বিদায় বেলা দেখা মিললো অশ্রুসিক্ত ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।
হয়তো বিশ্বকাপ থেকে শেষ বিদায় নিয়ে ফেলেছেন। সিআরসেভেনের বিদায়ে মরুর বুকে আরো এক মহারথীর হৃদয়ভাঙার গল্প।
যে গল্পে এবার কেঁদেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, যে গল্পে কেঁদেছেন লাখো কোটি ফুটবল সমর্থক।
আগের দিন ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমারের বিদায়, একই মঞ্চে একদিনের ব্যবধানে স্বপ্নভঙ্গ সিআরসেভেনের।
আটলাস সিংহদের ভয়াল গর্জনের রাতে বিদায় ঘণ্টা বাজলো পর্তুগালের। তবে, রোনালদোর বোনের বিশ্বাস হয়তো ২০২৬ বিশ্বকাপেও ভাইকে দেখবেন মাঠ মাতাতে। ম্যাচ শেষে ব্যক্তিগত ইন্সটাগ্রাম স্টোরিতে এক পোস্টে তিনি লিখেন, '৪১ বছর বয়স প্রাইম টাইম'
যদিও এটা স্রেফ আবেগী বার্তা। ২০২৬ বিশ্বকাপের সময় রোনালদোর হবে ৪১। এই বয়সে এসে এখন পর্যন্ত মাত্র চারজন খেলেছেন বিশ্বকাপে।
আর চল্লিশোর্ধ সাত ফুটবল খেলেছেন বিশ্বকাপের ইতিহাসের। তাও কি-না এই সাত জনের ছয়জনই ছিলেন গোলরক্ষক।
২০১৮ বিশ্বকাপে মিশরের হয়ে খেলেব ৪৫ বছর বয়সী এসাম আল হাদারি। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলারও তিনি। ২০১৪ বিশ্বকাপে ৪৩ বছর বয়সী ফারিদ মন্ড্রাগন খেলেছিলেন কলম্বিয়ার হয়ে।
তবে, এই তালিকায় একমাত্র রজার মিলার যিনি ছিলেন একজন স্ট্রাইকার। এই ক্যামেরুন তারকা ৪২ বছর বয়সেও মাতিয়েছিলেন বিশ্বকাপ।
৪১ বা তার বেশি বয়সে খেলা আরেক ফুটবলার ছিলেন প্যাট জেনিংস। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে নর্দান আইল্যান্ডের হয়ে খেলেন তিনি।
সে হিসেবে হয়তো আরো এক বিশ্বকাপ খেলতেও পারেন সিআরসেভেন। সেই ফিটনেস আর দুরন্তপনাও যে আছে এই পর্তুগিজ তারকার মাঝে। তবে সবই নির্ভর করছে এই তারকার ওপর।
মরক্কোর বিপক্ষে বিদায়ের ম্যাচে নেমেই অবশ্য বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন রোনালদো। পুরুষদের ফুটবলে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলার বাদের আল মুতাওয়াকে ছুঁয়ে ফেলেছেন তিনি।
১৯৬ ম্যাচ খেলে দীর্ঘ সময় তালিকার এক নম্বরে ছিলেন কুয়েতের এই ফুটবলার। গতকাল মাঠে নেমেই এই তালিকায় তার পাশে বসলেন রোনালদো।
বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের একদিন বাদেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে পোস্ট করেন সিআরসেভেন।
সেখানে তিনি লিখেন, পর্তুগালের জার্সিতে বিশ্বকাপ জেতা ছিলো আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। ভাগ্যক্রমে আমি পর্তুগাল সহ আন্তর্জাতিক মানের অনেক শিরোপা জিতেছি।
কিন্তু, নিজ দেশের নাম বিশ্ববাসীর কাছে সেরা হিসেবে তুলে ধরাই ছিল আমার লক্ষ্য। আমি এটার জন্যই লড়াই করেছি, কঠোর পরিশ্রম করে গেছি।
শেষ ৫ টি বিশ্বকাপের প্রতি আসরেই দলের হয়ে আমি গোল করেছি। আমার চারপাশে দুর্দান্ত সব খেলোয়াড়রা খেলেছেন। আমাদেরকে লক্ষ লক্ষ পর্তুগিজ নিয়মিতই সমর্থন দিয়েছেন। আমি আমার সবকিছু দিয়েছি। আমি কখনোই আমার লড়াই থেকে সরে যাইনি।
দুঃখজনকভাবে গতকাল আমাদের বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হয়েছে। এখন আমি সবাইকে বলতে চাই। অনেক কিছুই বলা হয়েছে, ভাবা হয়েছে, লিখা হয়েছে, আমাকে নিয়ে।
আমি সবসময় আমাদের দলের লক্ষ্যের পেছনে ছুটেছি। আমি কখনোই আমার সতীর্থদেরকে ছেড়ে চলে যাবো না, পাশে থাকবো, আমার দেশের প্রতি মুখিয়ে থাকবো।
পর্তুগালকে ধন্যবাদ, কাতারকেও ধন্যবাদ। স্বপ্নটা বেশ মধুর ছিল, যতক্ষণ এটা আমার জন্য বেঁচে ছিল।
রোনালদোর এই আবেঘন স্ট্যাটাস যে ছুয়ে গেছে লাখো কোটি ভক্তদের হৃদয়। তবে, ৪১ বছর বয়সে রোনালদো খেলবেন কি-না, বোনের কথা রক্ষা করতে পারবেন কি-না সেটা সময়ই বলে দিবে।
যদিও লিওনেল মেসির রঙে এখনো রঙিন বিশ্বকাপ। তবে, নেইমার-রোনালদোর মতো দুই বড় তারকার বিদায়ে বিশ্বকাপের রঙ যে এখন অনেকটাই ফিঁকে।
ক্যারিয়ার জুড়ে মাথা উচিয়ে মাঠ মাতানোর পর বিশ্বমঞ্চে মাথা নুইয়ে বিদায়। সব স্বপ্ন সত্যি হয় না, সব গল্পের শেষটাও আসলে সুন্দর হয় না। বিশ্বমঞ্চে রোনালদোর গল্পটাও হয়তো শেষ হলো হতাশায়, তিক্ততায়, ব্যর্থতায়।