কাতারের রাজধানী দোহার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াত মাধ্যম হলো দোহা মেট্রো রেল নেটওয়ার্ক। ২০২২ ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে কাতারে আগত পর্যটকদের কাঙ্ক্ষিত ভেন্যুতে পৌঁছে দিতে অসামান্য অবদান রাখছে এটি।
দোহার হামাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এবং বিশ্বকাপের জন্য নির্মিত আটটি এয়ারপোর্টের পাঁচটিতেই সরাসরি মেট্রো ব্যবহার করে যাওয়া যায়। বর্তমানে প্রতিদিন-ই মেট্রোর অভ্যন্তরে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ফুটবল প্রিয় মানুষদের দেখা মেলে।
বিশ্বকাপের আমেজ ফুটিয়ে তুলতে সাজানো হয়েছে মেট্রো স্টেশন এবং ট্রেনের বিভিন্ন অংশ। বর্তমানে মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে বিনামূল্যে মেট্রো সেবা নিতে পারেন যাত্রীরা।
দোহায় মেট্রোরেল প্রথম যাত্রা শুরু করে ২০১৯ সালে। রেললাইনের অধিকাংশ-ই নির্মাণ করা হয়েছে মাটির নিচ দিয়ে। মেট্রো রেলের পথ লাল, সবুজ এবং সোনালী এই তিন অংশে বিভক্ত।
তিনটি লাইন রাজধানীর ভিন্ন ভিন্ন অংশে যাত্রী পরিবহন করে। সবমিলিয়ে ৭৬ কিলোমিটার রেল নেটওয়ার্কে স্টেশন আছে ৩৭ টি।
প্রতিটি ট্রেন ৬০ মিটার দীর্ঘ এবং সর্বোচ্চ ৪১৬ জন যাত্রী পরিবহন করতে পারে। ট্রেনের ভেতরের অংশ স্ট্যান্ডার্ড, ফ্যামিলি এবং গোল্ড এই তিনটি ক্লাসে বিভক্ত।
এর মধ্যে ফ্যামিলি ক্লাস একা ভ্রমন করছেন এমন নারী এবং সপরিবারে মেট্রোতে চড়েছেন এমন যাত্রীদের জন্য।
অপরদিকে, গোল্ড ক্লাসে কেবলমাত্র ট্রাভেল কার্ড আছে এমন যাত্রীরা-ই ভ্রমণ করতে পারবেন। এজন্য গুনতে হবে অতিরিক্ত অর্থ।
মেট্রোরেলের প্রতিটি ট্রেনে ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। কোনোপ্রকার চালক ছাড়া নিজে নিজেই ঘন্টায় সর্বোচ্চ ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে ট্রেনগুলো।
ট্রেনের ভেতরে রয়েছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রতিটি কোণায় সংযুক্ত আছে সিসিটিভি ক্যামেরা। যাত্রীদের সুবিধার জন্য রয়েছে পাবলিক ওয়াইফাইও।
এমনকি, গোল্ড ক্লাসের যাত্রীদের জন্য মোবাইল কিংবা ল্যাপটপ চার্জ করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে! ট্রেনে উঠে মোবাইলের চার্জ ফুরিয়ে যাওয়ার বিড়ম্বনায় পড়তে হয়না এখানে।
মেট্রো স্টেশনগুলোর নকশার দিকেও নজড় রেখেছে কর্তৃপক্ষ। আধুনিকতার পাশাপাশী কাতারের ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে তুলবে এমনভাবেই সাজানো হয়েছে প্রতিটি স্টেশন।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ হলো মিশিরেব স্টেশন। এখানে একসাথে তিনটি লাইন এসে সংযুক্ত হয়েছে। গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য লাইন পরিবর্তনের দরকার পড়লে যাত্রীরা এখানে এসে নামেন।
মিশিরেব স্টেশন এতটাই বিলাসবহুল যে, এর ভেতরে ঢুকে কোনো আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টের টার্মিনাল বলে মনে হবে।
স্টেশনটির নকশা রূচিসম্মত এবং আধুনিক। প্রতিটি কোণা একদম ঝকঝকে পরিস্কার। সবমিলিয়ে যাত্রীদের অসুবিধে হওয়ার কোনো কারণ নেই।
মিশিরেব স্টেশনে মাটির নিচ থেকে শুরু করে ওপর পর্যন্ত মোট ৫টি তলা রয়েছে। সবার ওপরের তলায় স্টেশন থেকে বের হওয়ার পথ, এর নিচের তলায় টিকেট কাউন্টার, তার পরে বিভিন্ন দোকানপাট এবং বাকি দুই তলা লাইন পরিবর্তনের জন্য।
তবে, এতসব অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধার ভীড়ে পরিবেশের কথাও মাথায় রেখেছে কাতার সরকার। কার্বন নিঃসরণ কমাতে ট্রেনগুলোতে ব্যবহার করা হয়েছে রিজেনারেটিভ ব্রেকিং সিস্টেম। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে জ্বালানীর অপচয় রোধ করা যায়।
তবে, এমন আধুনিক এবং সুবিশাল পরিসরের একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে কম কাঠ খোড় পোড়াতে হয়নি। সম্পূর্ণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে খরচ হয়েছে ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এখনো এর কিছু অংশের নির্মাণ কাজ বাকি রয়ে গেছে, যা শেষ হতে সময় লাগবে আরও ৪ বছর।
সবমিলিয়ে মেট্রো রেলের ক্ষেত্রে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোকেও হার মানাবে দোহা। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত পর্যটকেরাও এ ব্যাপারে সায় দিয়েছেন।