প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয় - জীবনানন্দ দাশের লেখা এই লাইন প্রকৃতির চরম এক সত্য।
আর সেই সত্যের অংশ হিসেবেই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে লিওনেল মেসি বিদায় নিতে চলেছেন। বহুল আকাঙ্খিত কাতার বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচটি হতে যাচ্ছে আকাশি-সাদা জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ।
সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে জয়ের পর আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যমে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে নিজের অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন লিওনেল মেসি।
লাতিন আমেরিকার এই তারকা ফুটবলার জানান, ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ খেলার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলতে পারায় তিনি অত্যন্ত খুশি।
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে পা রাখেন লিওনেল মেসি। এরপর থেকে গত দেড় যুগ দেশের জার্সিতে মাঠ মাতিয়ে রেখেছিলেন তিনি। এবারের বিশ্বকাপেও তাঁর কাঁধে ভর করেই ফাইনালে পৌঁছে গিয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশটি।
চলতি কাতার বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি আছেন দুর্দান্ত ফর্মে। প্রতি ম্যাচেই দর্শকদের উপহার দিচ্ছেন রোমাঞ্চকর পারফরম্যান্স। কাতার বিশ্বকাপে ইতোমধ্যে ছয় ম্যাচ খেলে পাঁচ গোল করেছেন তিনি।
এছাড়া সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও তিনটি গোল। শুধু গোল বা অ্যাসিস্ট নয়; ড্রিবলিং, পাসিংয়েও নজর কেড়েছেন এই তারকা।
সবমিলিয়ে বিশ্বকাপে নিজের আগের সাফল্যকে ছাপিয়ে গেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। এবার নতুন এক রেকর্ডের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি, যা নিঃসন্দেহে ঈর্ষান্বিত করবে পেলে, রোনালদো নাজারিও, ম্যারাডোনার মত কিংবদন্তিদের।
গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ খ্যাত ফিফা বিশ্বকাপে দুইটি গোল্ডেন বল জিতে নতুন এক মাইলফলক ছোঁয়ার সুযোগ এসেছে এই সুপারস্টারের হাতের নাগালে।
সেমিফাইনালের বাধা টপকে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তোলায় খুব সম্ভবত তাঁর হাতেই উঠবে টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার।
এমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর এবারের আসরের সোনালী বলটিই মেসিরই প্রাপ্য৷ যদিও এই অভিজ্ঞ তারকাকে এক্ষেত্রে কিলিয়ান এমবাপ্পের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে। পুরো বিশ্বকাপ জুড়ে এই তরুণও আছেন দারুণ ছন্দে।
যদি শেষপর্যন্ত লিওনেল মেসি আরো একবার বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন, তবে সেটি হবে এই ফরোয়ার্ডের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সেরা কীর্তিগুলোর একটি।
এখন পর্যন্ত কোন ফুটবলারই বিশ্বকাপে দুইবার গোল্ডেন বল জিততে পারেননি। দুইটি গোল্ডেন বল জেতার বিরল রেকর্ড-ই নয়, লিওনেল মেসির এবারের বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স দিয়ে ঝড় তুলেছেন রেকর্ড বইয়ে।
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে গোল করে নিজ দেশের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় যৌথভাবে শীর্ষে উঠে এসেছিলেন লিওনেল মেসি। সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আবারো গোল করে এককভাবে এই তালিকায় সবার উপরে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।
গোল্ডেন বুট জয়ের দৌড় থেকেও খুব একটা পিছিয়ে নেই লিওনেল মেসি। এবারের বিশ্বকাপ আসরে সর্বোচ্চ পাঁচ গোল করেছেন ফরাসি তরুণ কিলিয়ান এমবাপ্পে।
তাঁর চেয়ে এক ম্যাচ বেশি খেলে সমান সংখ্যক গোল করেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। এছাড়া হুলিয়ান আলভারেজ এবং ফরাসি স্ট্রাইকার অলিভার জিরুদ করেছেন চারটি করে গোল।
সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় বাকিদের কারোই আর গোলসংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ নেই। তাই ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে হয়তো বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটও জিততে পারেন মেসি।
আবার বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ সংখ্যক প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার জিতেছেন লিওনেল মেসি। এখন পর্যন্ত দশবার এটি নিজের করে নিয়েছেন তিনি, যেখানে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো জিতেছেন সাতবার।
আপাতত অপেক্ষা শুধুই মহারণের; লিওনেল মেসি তাঁর ক্যারিয়ারের অপূর্ণ বিশ্বকাপ স্বপ্নকে পূরণ করতে মাঠে নামবেন কাতারের দোহা স্টেডিয়ামে। ১৮ তারিখের সেই ম্যাচের পরেই শেষ হবে পিএসজি ফরোয়ার্ডের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার৷
লিওনেল মেসি মানেই ভিন্ন কিছু, পায়ের জাদুতে দর্শকদের হৃদয় জেতা, প্রতিপক্ষকে বোকা বানিয়ে গোল করা ও করানোর কারিগর তিনি।
ট্রফি জয়ের স্বপ্ন পূরণ করে নিজেকে আরো সমৃদ্ধ করার সম্ভাব্য শেষ সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে নিশ্চিত ভাবেই সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার।