বাংলাদেশের নাগরিকত্ব চেয়ে আবেদন করেছেন এক পাকিস্তানি! শুধু নাগরিকত্ব নয়, মৃত্যুর পর বাংলাদেশের মাটিতেই সমাহিত হতে চান তিনি।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে জেলও খেটেছিলেন এই ব্যাক্তি। এরপর নিজ দেশ পাকিস্তানেই বিশ্বাসঘাতকতা ও ঘৃণার শিকার হন।
আলোচিত এই পাকিস্তানির নাম । বাংলাদেশের নাগরিকত্ব এবং এ দেশের মাটিতে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা জানিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠি লিখেছেন তিনি।
তার লেখা চিঠিটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেয়ার কাজ করছে ‘আমরা একাত্তর’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
সৈয়দ আসিফ শাহকারের এমন আবেদনের ঘটনা এবার প্রথম ঘটেনি। আরো প্রায় আট বছর আগে ২০১৪ সালেও তিনি বাংলাদেশ সরকার কাছে চিঠি লিখেছিলেন।
যেখানে তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়া এবং তার মৃত্যুর পর বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
তবে সেবার বাংলাদেশের সরকারের কাছ থেকে কোনরূপ সাড়া পাননি এই পাকিস্তানি। তাই এরপর নিজের ইচ্ছের কথা সরাসরি লিখে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে।
মূলত বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা থেকেই এমন বাসনা সৃষ্টি হয়েছে সৈয়দ আসিফ শাহকারের হৃদয়ে। আর এই ভালবাসা আজকালের নয় বরং তৎকালীন পাকিস্তান আমল থেকেই।
সেই সময় বাঙালিদের যৌক্তিক আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন তিনি। পাকিস্তানের নাগরিক হয়েও স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করেছিলেন আসিফ শাহকার।
২০১২ সালে বাংলাদেশের সরকার ১৯৭১ সালে ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে ‘ফ্রেন্ডস অব লিবারেশন ওয়ার’ সম্মাননা দেয়।
তিনি বর্তমানে সুইডেনে বসবাস করেন। লম্বা সময় ধরে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৭ সালে সুইডিশ হাইকোর্ট বিভাগ থেকে বিচারপতি হিসেবে অবসর নিয়েছিলেন সৈয়দ আসিফ।
১৯৪৯ সালে পাঞ্জাবে জন্ম গ্রহণ করা আসিফ শাহকার ছাত্রাবস্থায় পাকিস্তানের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার সংঘটিত হলে এটির প্রতিবাদ জানান এই তরুণ।
ফলে শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে গ্রেপ্তার হতে হয় তাঁকে। দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় জেলে কাটিয়ে ১৯৭২ সালে বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান এই বিচারপতি।
জেলখানা থেকে ছাড়া পেলেও নিজ দেশে আবারো অদৃশ্যভাবে বন্দি হয়ে পড়েন আসিফ। পাকিস্তানের মানুষদের কাছ থেকে তিনি বিশ্বাসঘাতক উপাধি পান এবং প্রবল ঘৃণার শিকার হতে থাকেন।
তাই বাধ্য হয়ে ১৯৭৭ সালে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে সুইডেনে চলে যান। সুইডেনে গিয়ে আইন পেশায় যুক্ত হন সৈয়দ আসিফ, তাঁর স্ত্রীও একজন সুইডিশ আইনজীবি। পেশাগত দায়িত্ব ছাড়াও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেন তিনি।
তবে শুরুর দিকে সুইডেনে বসবাসকারী পাকিস্তানি এবং বাংলাদেশী উভয় জাতির কাছেই অবহেলিত ছিলেন বিচারপতি শাহকার। বাংলাদেশীরা তাকে পাকিস্তানি এবং পাকিস্তানিরা তাকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে ঘৃণা করতো।
তবে ২০০০ সালে সুইডেনে নিযুক্ত বাংলাদেশ মিশনের একজন কর্মকর্তার সাথে তার পরিচয় হয়। সেই কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রথমবার সেখানকার বাংলাদেশিদের তাদের ভুল ধারণা ভেঙে দেন তিনি। সে বছরই প্রথমবার বাংলাদেশে আসার কথা ভাবেন আসিফ শাহকার।
২০১০ সালে নতুন করে সুইডেনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সাথে যোগাযোগ করেন তিনি। দুই বছর পর বাংলাদেশের সরকার ১৯৭১ সালে তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে ‘ফ্রেন্ডস অব লিবারেশন ওয়ার’ সম্মাননা দেয় এই বুদ্ধিজীবিকে।
নিজের মনে বাংলাদেশকে ধারণ করেন বলেই মৃত্যুর পর এই দেশে সমাহিত হতে চান সৈয়দ আসিফ শাহকার। বাংলাদেশের নাগরিক না হলে এখানে সমাধিস্থ হতে পারবো না, তাই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব চেয়ে আবেদন করেছেন তিনি।