২০১০ সালে যখন বিশ্বকাপের ২২তম আসরের আয়োজক দেশ হিসেবে কাতারের নাম ঘোষণা করা হয়, তখন ফুটবল বিশ্বে কোন পরিচিতি ছিল না দেশটির।
এমনকি তাদের ছিল না কোন মানসম্মত স্টেডিয়াম। এছাড়া অধিক তাপমাত্রার সমস্যা তো ছিলই। তবে সব সমস্যা জয় করে বিশ্বকে দুর্দান্ত একটি টুর্নামেন্ট উপহার দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি৷
স্বাগতিক দল হিসেবে কাতার মাঠে খারাপ খেললেও মুগ্ধকর আয়োজনের জন্য দেশটির প্রশংসা করতে কার্পণ্য করছেনা কেউই।
স্বয়ং ফিফা সভাপতি জানিয়েছেন বিশ্বকাপের এবারের আসরটি তাঁর দেখা সেরা সংস্করণ। স্বাভাবিকভাবেই তাই বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে অনন্য এক স্থানে লেখা থাকবে কাতারের নাম।
ছয় গোলের রোমাঞ্চকর এক লড়াই শেষে শ্বাসরুদ্ধকর টাইব্রেকার; এরপরই জানা গিয়েছিল কাতার বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নের নাম। পেনাল্টি শুটআউটে ফ্রান্সকে হারিয়ে শিরোপার স্বাদ পায় আর্জেন্টিনা।
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মধ্য দিয়ে পর্দা নেমেছে কাতার বিশ্বকাপের।
কাতার বিশ্বকাপ ঘিরে বিতর্ক কম ছিল না। আয়োজক দেশ হতে ঘুষ দেয়ার অভিযোগ উঠেছিল তাদের বিরূদ্ধে।
এছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিশ্বকাপ ঘিরে কাতারে শ্রমিকদের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনাও আলোচনায় উঠে এসেছিল। আবার নেশাজাতীয় পানীয় ও সমকামিতার মত ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে ছিল কাতারি সরকার।
তবে টুর্নামেন্ট শুরু হতেই মাঠের বাইরের এসব আলোচনা ভুলে ফুটবলপ্রেমীরা মুগ্ধ হয়েছিলেন অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর পারফরম্যান্স আর কাতারের আয়োজন দেখে।
আধুনিক প্রযুক্তির সমাহার, পর্যটক-বান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রশংসা কুড়িয়েছে আরব দেশটি। সৌদি আরব, জাপানের মত তুলনামূলক ছোট দেশগুলোর অপ্রত্যাশিত জয় এবারের বিশ্বকাপের উন্মাদনা বাড়িয়ে দিয়েছিল কয়েকগুণ।
সবমিলিয়ে সুন্দর আয়োজন আর আতিথেয়তায় পুরো বিশ্বকে মুগ্ধ করেছে কাতার। প্রথম আরব দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশ হয়েছিল তারা। অতীতের সব বিতর্ক ধামাচাপা পড়েছে কাতারের সাফল্যের নিচে।
বিশ্বকাপের মতো আসর আয়োজনের জন্য কাতার সম্ভবত সবচেয়ে অনুপযুক্ত দেশগুলোর একটি ছিল। খেলার মাঠের ঘাটতি তো ছিলই, সেটির পাশাপাশি অবকাঠামো এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য বিবেচনায় দেশটি ছিল ফুটবল বিশ্বকাপের জন্য ঝুকিপূর্ণ।
যদিও এসব সমস্যা দূর করতে কাতার দুইহাতে টাকা খরচ করেছে। এক মাসের একটি ফুটবল উৎসবের জন্য পুরো দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সম্ভাব্য সবকিছু করেছে তারা।
প্রচুর অর্থ ও সময়ের বিনিময়ে সাতটি নতুন স্টেডিয়াম নির্মাণ করেছে দেশটি। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত খাতে ব্যাপক সংস্কার এনেছে।
সবমিলিয়ে কাতার কর্তৃপক্ষ এই বিশ্বকাপ আয়োজন করার জন্যে প্রায় ২২০ বিলিয়ন ইউএস ডলার খরচ করেছেন; যা বাংলাদেশের বার্ষিক বাজেটের প্রায় তিনগুণ।
এছাড়া ফুটবলীয় বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে উঠার জন্য শত শত কোটি ডলারে ফুটবল ক্লাব ও ক্রীড়া স্বত্ব কিনেছে বিভিন্ন কাতারি প্রতিষ্ঠান।
বিখ্যাত ফরাসি ক্লাব পিএসজি এবং টিভি চ্যানেল বেইন স্পোর্টসের মালিকানা কাতারের। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন লিওনেল মেসি এবং রানার আপ কিলিয়ান এমবাপ্পে দুইজনেই পিএসজিতে খেলেন।
বিশ্বকাপ আয়োজনের পিছনে কাতারের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বের কাছে নিজেদের পরিচিতি বাড়ানো। পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধ করে পর্যটন শিল্পকে বিকশিত করা।
আর এই উদ্দ্যেশ্য বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে আরব দেশটি। মাত্র চার লাখ নাগরিকের দেশ কাতারের নাম এখন প্রায় সবার মুখে মুখে।
প্রত্যাশার চেয়ে অধিক জমকালো আর মনে রাখার মত একটি বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছে কাতার। তাই আর্জেন্টিনার পাশাপাশি কাতারকেও বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে চ্যাম্পিয়ন বলা যেতেই পারে।