এবারের বিশ্বকাপের ফাইনালে তান্ডব চালিয়েছেন আর্জেন্টাইন ফুটবলার এঞ্জেল ডি মারিয়া। পরিসংখ্যান বলছে, আর্জেন্টিনার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল রয়েছে মারিয়ার।
দলে তাঁর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।
অথচ এই তারকার শৈশব কেটেছে চরম দারিদ্র্যে। কিংবদন্তী এই খেলোয়াড়ের জন্ম আর্জেন্টিনার রোজারিও নামক ছোট্ট এক মফস্বল শহরে।
১৯৮৮ সালের ১৪ ই ফেব্রুয়ারিতে জন্ম নেয়া মারিয়ারা ছিলেন তিন ভাই-বোন। বাবা-মা দুজনই ছিলেন কয়লা খনির শ্রমিক।
তাদের তিন সন্তানের মধ্যে সব থেকে দূরন্ত ছিলেন মারিয়া। দেখতে কিছুটা রোগা পাতলা হলেও তার শারীরিক শক্তি ছিলো প্রচুর।
অস্বাভাবিক দস্যিপনার কারন জানতে একদিন মা তাকে নিয়ে গেলেন ডাক্তারের কাছে। ব্রাজিলের মতো আর্জেন্টিনাও ফুটবলের দেশ।
তাই কাল বিলম্ব না করে মারিয়াকে ফুটবল খেলার পরামর্শ দেন ডাক্তার। এতে দ্বিমত পোষণ করেন নি মারিয়ার মা। বরং ছেলেকে ফুটবল খেলতেই উৎসাহ দেন।
কিন্তু বল কেনার সামর্থ্য ছিল না তাদের। তাই মাত্র দশ বছর বয়সে পিতা-মাতার সাথে কয়লা খনিতে যোগ দেন ডি মারিয়া। উদ্দেশ্য পেট আর খেলার জন্য অর্থ উপার্জন।
দুর্দান্ত ফুটবল খেলতেন মারিয়া। অনবরত খেলার কারনে প্রতি দুই মাসে বুট জুতো ছিঁড়ে যেত তার। কিন্তু প্রতিবার নতুন জুতো কেনার সামর্থ্য ছিল না। তাই তার মা জুতো জোড়া আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিতেন।
দুর্দান্ত মারিয়া কৈশোরেই নিজ এলাকার দলের হয়ে একাই দিয়েছিলেন ৬৪ টি গোল। পরে রোজারিও সেন্ট্রাল ফুটবল দলের কোচের পক্ষ থেকে আমন্ত্রন পান তিনি।
দলের নিয়মিত প্রশিক্ষণে অংশ নেয়াটা মারিয়ার পক্ষে সহজ সাধ্য ছিল না । তখন পাশে এসে দাঁড়ান তার মা আর 'গ্রাসিয়েলা' নামের সাইকেল।
পুরনো মরিচা ধরা হলুদ রঙের এই সাইকেলে করে প্রতিদিন মা ডায়ানা হার্নান্দেজ, ডি মারিয়াকে মাঠে অনুশীলনের জন্য নিয়ে যেতেন।
কড়া রোদ অথবা ঝুম বৃষ্টি, কোনো কিছুই ডায়ানাকে থামাতে পারতো না। সাইকেলের পেছনে ছেলে আর একপাশে মেয়েকে বসিয়ে দিনের পর দিন সাইকেল চালিয়ে এসেছেন ডি মারিয়ার মা।
পনের বছর বয়সে এসেও সময় মতো দেহের বিকাশ না হওয়ায় সেন্ট্রাল দলের কোচ দ্বারা একবার অপমানিত হয়েছিলেন তিনি।
তখনও তাকে নতুন করে আশা জুগিয়েছিলেন তার মা। বলা যায়, ডি মারিয়ার তারকা ফুটবলার হয়ে উঠার পেছনে তার মার রয়েছে অসাধারন অবদান।
মাত্র তের বছর বয়সে ডি মারিয়া যোগ দেন রোজারিও সেন্ট্রাল ইয়ুথ ক্লাবে। সতের বছর বয়সে আর্জেন্টিনার প্রিমিয়াম ডিভিশন ক্লাবের হয়ে খেলার মাধ্যমে পেশাদার ফুটবলে পা রাখেন তিনি।
২০০৭ সালের দিকে তিনি পান রাশিয়ার রুবিন কাজানে খেলার সুযোগ। যদিও সেখানে যোগ দেননি। একই বছর ফিফা অনূর্ধ্ব বিশ বিশ্বকাপে তার যোগ্যতার প্রমাণ দেখে বিশ্ববাসী।
ফলে বিভিন্ন ইউরোপীয় দল তার প্রতি আগ্রহ দেখায়। পরবর্তীতে তিনি যোগ দেন বেনফিকাতে। ২০১৫ সালের ৩০ জুন বেনফিকার সাথে নতুন করে চুক্তি করলে তার তার দাম উঠে ৪০ মিলিয়ন ইউরো।
বেশ কিছু প্রসিদ্ধ ইউরোপীয় ক্লাবের হয়ে খেলার পর বর্তমানে ডি মারিয়া জুভেন্টাসে এসে থিতু হয়েছেন। সেই সাথে মাঠ মাতাচ্ছেন নিজ দেশ আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে।
কাতার বিশ্বকাপের ফাইনাল জয়ের পেছনেও রয়েছে তার অবদান। সেদিন বল জালে জড়িয়েই কেদে ফেলেছিলেন তিনি।
বিশ্বকাপের আগে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন আনহেল ডি মারিয়া। আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার বলেছিলেন আসর শেষেই বুটজোড়া গুটিয়ে রাখবেন।
তবে সম্প্রতি জানা গেছে, জাতীয় দলের হয়ে আরো কিছুদিন খেলা চালিয়ে যেতে চান তিনি।
২০২৪ কোপা আমেরিকতাতেও খেলতে পারেন এই জুভেন্টাস তারকা।