ক্রিকেটকে বলা হয় অনিশ্চয়তার খেলা। ক্রিকেটের সাথে জড়িয়ে ক্রিকেটারদের জীবনটাও অনেক সময় আটকে যায় এই অনিশ্চয়তার টাইম লুপে।
কেউ কেউ সেই অনিশ্চিত টাইম লুপ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন, কেউ আবার আটকে যান চিরতরে। এমনই এক টাইম লুপে আটকে গিয়েছিলেন একসময়ের দেশসেরা ফিনিশার- নাসির হোসেন।
বয়সটা সবে ৩০ পেরিয়েছে, এরই মধ্যে অনেকেই তাকে ফেলে দিয়েছিলেন বাতিলের খাতায়। তবে চলতি বিপিএলে ধারাবাহিক পারফর্মেন্স করে আবারও তিনি আভাস দিচ্ছেন চেনারূপে ফেরার।
জাতীয় দলের জার্সিতে সবশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটি খেলেছিলেন পাঁচ বছর আগে। এতদিন জাতীয় দলের বাইরে থেকেও বিভিন্ন সময়ে এসেছেন সংবাদের শিরোনামে। তবে সেটা ক্রিকেটের জন্য নয়, বরং অক্রিকেটীয় কর্মকান্ডে জড়িয়ে।
ব্যক্তি জীবনের সাথে মাঠের ক্রিকেটকে একাকার করে হারিয়ে যেতে বসেছিলেন বিস্মৃতির অতল গহ্বরে। তবে ফিরে আসার নতুন উপাখ্যান লেখার জন্য ২২ গজের চেয়ে বড় মঞ্চ আর কিইবা হতে পারে।
কথাটা নিশ্চয়ই নাসির উপলব্ধি করেছেন, মনে-প্রাণে বিশ্বাসও করেছেন। তার ঝলকই তিনি দেখাচ্ছেন এবারের বিপিএলে।
টুর্নামেন্ট এখনও মাঝপথ পেরোয়নি। এরই মধ্যে ৬ ম্যাচে ২টি অর্ধশতকে ২৬৯ রান তুলে ফেলেছেন নাসির। স্ট্রাইক-রেটটাও নেহাতই কম নয়।
আরও পরিষ্কার করে বললে জাতীয় দলের বর্তমান ফিনিশারদের চেয়ে যথেষ্ট ভালো। সেইসাথে নামের পাশে আছে ৭টি উইকেট। এসব কিছুই যেন জ্বলজ্বল করে জানান দিচ্ছে নাসিরের প্রত্যাবর্তনের।
অথচ বিপিএল শুরুর আগেও কেউ ভাবতেই পারেনি আসরের সেরা রান সংগ্রাহকদের পাশে নাম থাকবে নাসিরের।
ভাবার কথাও না। কারণ একে তো ফিটনেসের যাচ্ছেতাই হাল। তার উপর ঘরোয়া ক্রিকেটেও নেই সরব উপস্থিতি।
তবে এমনটা হওয়ার মোটেও কোনো কারণ ছিল না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নাসিরকে ভাবা হতো সাকিবের সহকারী অস্ত্র হিসেবে।
দলের বিপদে কখনো ব্যাট হাতে ঢাল তুলে দাঁড়াতেন। কখনো আবার নিখুঁত ফিনিশিংয়ে দলের তরীটা ভেড়াতেন জয়ের বন্দরে।
বোলিংও ছিল যথেষ্ট কার্যকরী। প্রয়োজনের সময় ব্রেক থ্রু এনে দিতে সাকিব-মাশরাফিরা বল তুলে দিতেন নাসিরের হাতে।
বল হাতে অধিনায়কের ভরসার প্রতিদান দিতেও ভুল করতেন না নাসির। সেইসাথে তার এগ্রেসিভ ফিল্ডিং তো ছিলই।
একটা ফুল প্যাকেজড অলরাউন্ডার হওয়ার জন্য যা যা দরকার, তার সবই ছিল নাসিরের মধ্যে।
তবে মাঠ ও মাঠের বাইরের জীবনকে নাসির সামলাতে পারেননি সমান তালে। উল্টো ব্যক্তিজীবনের অস্থিরতাকে টেনে এনেছেন মাঠের পারফরম্যান্সে।
যার দরুন ২০১৮ সালে তাকে বাদ দেওয়া হয় ওয়ানডে থেকে। টি-টোয়েন্টি থেকে বাদ পড়েছিলেন আরও বছর দেড়েক আগে।
জাতীয় দলে খেললে বাদ পড়তে হয়, পারফর্ম করে আবার ফিরেও আসা যায়। দেশের জার্সিতে একজন ক্রিকেটারের অভিষেক যেন এই শপথ করেই হয়। নাসিরও নিশ্চয়ই করেছিলেন, তবে রক্ষা করতে পারেননি।
জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ে ঘরোয়া ক্রিকেটেও হয়ে পড়েন অমনোযোগী। ২০২১ সালে তামিমা সুলতানা তাম্মিকে বিয়ে করেন নাসির হোসেন। বৈবাহিক জীবনের শুরুতেই তাদের উপর দিয়ে বয়ে যায় এক বিশাল ঝড়।
সেই ঝড় থামতেই স্ত্রীর আবদারে আবারও জাতীয় দলে ফেরার পণ করেন নাসির। এর পরের দৃশ্যটা সবাই দেখছেন, বিস্মিত হচ্ছেন। অনেকাংশে খুশিও হচ্ছেন বটে।
কারণ বর্তমানে জাতীয় দলে যাদের ফিনিশার হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাদের কারো কাছেই চাহিদা মাফিক সার্ভিস পাচ্ছে না দল। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বকাপের আগে নাসিরের ব্যাটে ভরসা খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে।
ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে জাতীয় দলে নাসির প্রত্যাবর্তনটা এবার হয়তো হয়েই যেতে পারে। সেইসাথে ফিনিশিংয়ে বাংলাদেশের দূর্বলতাটাও হয়তো কেটে যাবে মিস্টার ফিনিশারের কামব্যাকে।