ভালো ক্রিকেটার হওয়ার পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ কিভাবে হতে হয়, বিপিএল খেলতে এসে যেন সেটিই শেখালেন মোহাম্মদ রিজওয়ান।
ক্রিকেটীয় সত্তার বাইরেও নিজের অমায়িক ব্যক্তিত্ব দিয়ে, বাংলাদেশী সমর্থকদের হৃদয় ছুঁয়েছেন এই পাক-ব্যাটার।
এবারের বিপিএলে পাকিস্তানি এই ক্রিকোটারকে ঘিরে তাই বাংলাদেশী সমর্থকদের মাঝে দেখা গেছে বাড়তি উচ্ছ্বাস।
বর্তমান সময়ে টি-টোয়েন্টির সেরা ব্যাটারদের একজন মোহাম্মদ রিজওয়ান। অথচ বছর দুয়েক আগেও নামটা তেমন পরিচিত ছিল না ক্রিকেট পাড়ায়।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শুরুতে সাইডবেঞ্চে বসেই ম্যাচের পর ম্যাচ কাটিয়ে দেওয়া রিজওয়ান, গত কয়েক বছরে নিজেকে চিনিয়েছেন নতুন করে।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে মোহাম্মদ রিজওয়ানের পারফরম্যান্স গ্রাফ ছিল একেবারেই নিম্নমখুী।
অভিষেকের পর প্রথম ৫ বছরে টি-টোয়েন্টিতে মাঠে নামার সুযোগ পেয়েছিলেন মোটে ১৫ বার! এই ১৫ ইনিংসে ৪ থেকে ৭ , সব পজিশনে ব্যাটিং করে রিজওয়ানের রানসংখ্যা ছিল মাত্র ১৮৫!
এরপর মিডল অর্ডার থেকে রিজওয়ানকে এক লাফে ওপেনিংয়ে নিয়ে আসে পাকিস্তান। তারপরই বদলে যেতে শুরু করে দৃশ্যপট।
শেষ ২ বছরে ৫৭টি টি-টোয়েন্টি খেলে ৫০ উর্ধ্ব গড়ে করেছেন ২৪৫০ রান। এর মধ্যে অর্ধেকের চেয়ে বেশি ম্যাচে পেয়েছেন শতক বা অর্ধশতকের দেখা। ম্যাচ সেরা হয়েছেন মোট ১১ বার!
এই পারফরম্যান্সই প্রমাণ করে গত ২ বছরে নিজেকে কোন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন মোহাম্মদ রিজওয়ান।
দল থেকে বাইরে থাকার দিনগুলোতে নিজেকে ভেঙেচুরে গড়েছেন। অক্লান্ত পরিশ্রম করে হয়ে উঠেছেন খাঁটি সোনা। সেই সোনার মূল্য কতখানি তা এখন প্রমাণ করে চলেছেন প্রতি ম্যাচে।
মাঠে নেমে লম্বা ইনিংস খেলা কিংবা দলকে জয়ের ভিত গড়ে দেওয়া- এসব যেন এখন রিজওয়ানের প্রতি ম্যাচের দৃশ্য।
চলতি বিপিএলে কুমিল্লার আঁধার ঘরের মানিক হয়ে খেলতে এসেছিলেন এই পাকিস্তানি ব্যাটার।
রিজওয়ান যখন কুমিল্লা শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন, তখনও পয়েন্ট টেবিলের খাতা খুলতে পারেনি ভিক্টোরিয়ান্সরা।
তবে রিজওয়ানের আগমনে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় কুমিল্লা।
টানা ৩ হার দিয়ে আসর শুরু করা কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স এরপর জিতেছে টানা ৮ ম্যাচ। বিপিএলের ইতিহাসে এর আগে এমন কৃতিত্ব দেখাতে পারেনি আর কোনো দল।
কুমিল্লার এই অর্জনের পেছনে বড় অবদান রেখেছেন উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ রিজওয়ান।
কুমিল্লার হয়ে এবারের আসরে রিজওয়ান খেলেছেন মোট ৯ ম্যাচ। এই ৯ ম্যাচে ৪টি অর্ধশতকে রিজওয়ানের ব্যাট থেকে এসেছে মোট ৩২৭ রান।
তবে মাঠের পারফরম্যান্স ছাপিয়ে রিজওয়ান সমর্থকদের মনে দাগ কেঁটেছেন তার অমায়িক ব্যক্তিত্ব দিয়ে।
প্রতি ম্যাচের শেষে গ্যালারিতে ছুটে গেছেন, মিটিয়েছেন ভক্তদের সেলফি ও অটোগ্রাফের আবদার। এতো বড় ক্রিকেটার হয়েও তার এমন নিরংহকার আচরণে তাই মুগ্ধ হয়েছেন সবাই।
মোহাম্মদ রিজওয়ান মানুষটা বরাবরই এমন। ক্রিকেটীয় সত্তার বাইরেও যিনি ধারণ করেন নির্মল এক চরিত্র।
যেই চরিত্রে নেই কোন দম্ভ, নেই ছিটেফোঁটা অহংকার। যার পুরোটা জুড়ে রয়েছে শুধু বিনয় আর স্রষ্টার প্রতি অগাধ বিশ্বাস।
কখনো অনুশীলনের ফাঁকে, কখনো আবার খেলার বিরতিতে সতীর্থরা যখন হাসি ঠাট্টায় ব্যস্ত থাকেন, তখন মোহাম্মদ রিজওয়ান নিজেকে সপেঁ দেন এক আল্লাহর ইবাদতে।
অবসর সময়ে কিংবা বিমানে চড়ে অন্যরা যেখানে দু'কানে ইয়ারফোন গুঁজে বসেন, সেখানে মোহাম্মদ রিজওয়ানের হাতে শোভা পায় পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআন।
প্রেস বক্সে আসলেও সর্বশক্তিমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে কখনো ভুলেন না এই পাক-ব্যাটার।
দিনশেষে সৃষ্টিকর্তার প্রতি এমন একনিষ্ঠতাই, তাকে বড় করেছে, সবার চেয়ে আলাদা বানিয়েছে।