প্রায় দুই বছর জাতীয় দলের বাইরে থাকার পর, অবশেষে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন, স্পেনের রক্ষণভাগের প্রাচীর খ্যাত ডিফেন্ডার সার্জিও রামোস।
সিনেমা হোক কিংবা বাস্তব জীবন, ভিলেনরা সবসময়ই দর্শকদের চক্ষুশূল। তবে সেসব যুক্তি খাটে না রামোসের বেলায়।
ফুটবল মাঠের পুরোদস্তুর ভিলেন হয়েও, দিনশেষে তিনি ঠাঁই করে নিয়েছেন ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ের মণিকোঠায়।
মাত্র ১৯ বছর বয়সেই স্পেনের জার্সি গায়ে জড়িয়ে, 'লা রোহা'দের হয়ে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে, অভিষেকের রেকর্ড গড়েন সার্জিও রামোস।
২০০৪ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পরের বছরই, স্পেন জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামেন তিনি।
স্পেনের হয়ে রামোসের যখন অভিষেক হয়, তখন স্প্যানিশ ফুটবলে রাজত্ব চলছে জাভি-ইনিয়েস্তা-কার্লোস পুয়েলদের।
এতো এতো গ্যালাকটিকোদের ভিড়ে ক্যারিয়ার শুরু করা তরুণ রামোস, নিজের আলোতেই সব ছাপিয়ে এসেছিলেন লাইমলাইটে।
প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকারদের সামনে রক্ষণভাগের দেয়াল হয়ে, স্পেনকে অসংখ্য ম্যাচ জেতাতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সার্জিও রামোস।
অভিষেকের পর স্পেনের জার্সিতে একে একে ৩টি বৈশ্বিক শিরোপা জিতেছেন এই স্প্যানিয়ার্ড। ২০০৬ থেকে ২০১৮, এই সময়ে টানা ৪টি বিশ্বকাপে স্পেনের হয়ে আসর মাতিয়েছেন তিনি।
২০১০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ জয়ী স্পেন দলেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন রামোস। এরপর ২০১৮ এর রাশিয়া বিশ্বকাপে আর্মব্যান্ড হাতে স্পেনের প্রতিনিধিত্বও করেছেন তিনি।
বিশ্বকাপের পাশাপাশি ৩টি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে, ২০০৮ ও ২০১২ সালে ইউরো শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব আছে তার।
শুধুমাত্র মেজর শিরোপা জিতেই ক্ষান্ত হননি 'দ্য গ্ল্যাডিয়েটর' রামোস। স্পেনের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ডটিও নিজের করে নিয়েছেন তিনি।
ডিফেন্ডার হয়েও প্রতিপক্ষের জালে বল জড়াতে বেশ পারদর্শী ছিলেন সার্জিও রামোস। স্পেনের হয়ে খেলা ১৮০ ম্যাচে তার গোল সংখ্যা সর্বমোট ২৩টি।
এসব ছাড়াও এখন অবধি ফিফার বর্ষসেরা একাদশে জায়গা পেয়েছেন মোট ৯ বার। এর আগে কোনো ডিফেন্ডারের এতবার বর্ষসেরা একাদশে জায়গা পাওয়ার নজির নেই।
জাতীয় দলের পাশাপাশি, ক্লাব ফুটবলের অঙ্গনও নিজের আলোয় রাঙিয়েছে এই স্প্যানিশ ডিফেন্ডার।
রামোসের ক্লাব ক্যারিয়ারের হাতেখড়ি হয়েছিল স্পেনের ঘরের ক্লাব সেভিয়াতে। সেভিয়ায় তার বিষ্ময়কর প্রতিভা দেখে, ২০০৫ সালে তাকে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে নিয়ে আসে রিয়াল মাদ্রিদ।
রিয়ালে দীর্ঘ ১৬ বছরের ক্যারিয়ারে ৪টি ক্লাব কাপ, ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ৫টি লা-লিগাসহ, সর্বমোট ২২টি ট্রফি জিতেছেন মিস্টার মাদ্রিদিয়ান।
একজন ডিফেন্ডার হয়েও লা-লিগায় তার গোলের খাতাটা বেশ ভারি। লস ব্ল্যাঙ্কোসদের হয়ে রামোসের গোলসংখ্যা ৭৪টি।
তবে এতো এতো রেকর্ডের মালিক হয়েও, ফুটবলপ্রেমীদের কাছে রামোস খ্যাতি পেয়েছেন একজন 'ব্যাড বয়' হিসেবে।
রগচটা স্বভাবের কারণে রেফারির লাল কার্ডটার সঙ্গে, নিজেকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলেছেন এই স্প্যানিয়ার্ড।
পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে ২৩৫টি হলুদ কার্ড ও ২৮টি লাল কার্ড হজম করেছেন তিনি। লা-লিগার ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২০টি লাল কার্ড হজমের রেকর্ডটিও তার।
তবে অবাক করা ব্যাপার হলো, রামোসের ক্লাব ফুটবল ক্যারিয়ারে লাল কার্ডের ছড়াছড়ি থাকলেও, জাতীয় দলে কখনোই লাল কার্ড দেখেননি এই অ্যাগ্রেসিভ ডিফেন্ডার।
স্পেন জাতীয় দলের প্রতি তার নিবেদন কতখানি এই ছোট্ট পরিসংখ্যান থেকে ধারণা করা যায়।
খেলোয়াড় রামোসকে তার উগ্র আচরণের জন্য ঘৃণা করা গেলেও, তার যোগ্যতাকে কোনোভাবে অস্বীকার করার উপায় নেই।
বরং ইতিহাসের কিংবদন্তি ডিফেন্ডারদের ব্যক্তিত্ব এবং খেলার ধরণ পর্যালোচনা করা হলে, রামোসের মতো একজন পরিপূর্ণ ডিফেন্ডার দ্বিতীয়টি পাওয়া দুষ্করই হবে।