আজকের খবর


এক দেশপ্রেমিকের নীরব প্রস্থান


হেড অফ ডিজিটাল মিডিয়া

শামসুল আলম

প্রকাশিত:১২ এপ্রিল ২০২৩, ০৫:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার

এক দেশপ্রেমিকের নীরব প্রস্থান
পুরো বাংলাদেশ যখন ঘুমিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই শোনা গেল শোকের খবরটা। পরপারে চলে গেলেন বাংলাদেশের সূর্যসন্তান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, স্বাধীন বাংলাদেশের ওষুধনীতির যিনি মূল কারিগর, হাজারো মুক্তিযোদ্ধার প্রাণ যিনি বাঁচিয়েছিলেন, সেই জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিদায় নিলেন অনেকটা চুপিসারেই।  

১৯৮১ সালের ২৭ ডিসেম্বর, চট্টগ্রামের রাউজানে জন্ম নেন এই গুণী ব্যক্তি। দশ ভাইবোনের মাঝে তিনি ছিলেন সবার বড়। বকশীবাজার স্কুল, ঢাকা কলেজ এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজে পার করেছেন নিজের শিক্ষাজীবন। ১৯৬৭ সালে, যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস এ, জেনারেল ও ভাস্কুলার সার্জারিতে “এফআরসিএস” ডিগ্রি নিতে ভর্তি হন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। কিন্তু চূড়ান্ত পর্বের পরীক্ষার ঠিক আগে চলে আসে মুক্তিযুদ্ধের ডাক। 

দেশের জন্য অন্তঃপ্রাণ জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সেই ডাক উপেক্ষা করতে পারেননি। লন্ডনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে ডা. এম এ মোবিনের সাথে ছিঁড়ে ফেলেছিলেন পাকিস্তানি পাসপোর্ট। 
সেখান থেকে “রাষ্ট্রহীন নাগরিক” এর প্রত্যয়নপত্র নিয়ে, রওনা হন ভারতের উদ্দেশ্যে। সারাদেশের মানুষের কাছে, তরুণ এই ডাক্তার তখন দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের “একাত্তরের দিনগুলি”তেও উঠে এসেছে, জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সেই অসীম সাহসিকতার গল্প।  

লন্ডন থেকে কলকাতা এসেই শুরু হয়, জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অন্যরকম এক সংগ্রাম। দুই নাম্বার সেক্টরের কাছাকাছি গড়তে চাইলেন “বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল”। কিন্তু সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ রাজি হননি। জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছুটলেন অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী, তাজউদ্দিন আহমেদের কাছে। শেষ পর্যন্ত আগরতলার বিশ্রামগঞ্জের মেলাঘরে, হাবুল ব্যানার্জির আনারস বাগানে গড়ে তুলেন, বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল।

সেই হাসপাতালেই কমান্ডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন, ডা. সিতারা বেগম বীরপ্রতীক। স্বেচ্ছাসেবী নার্স ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল ও তার বোন সাঈদা কামাল। স্বাধীন বাংলাদেশে এসে ফিল্ড হাসপাতালের নাম হলো গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। যে নামটি পছন্দ করেছিলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। 

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র নিয়ে প্রথম নির্দেশনাও বঙ্গবন্ধুরই দেয়া। তার নির্দেশেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র কাজ করেছে স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষাসহ দেশ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সব অঙ্গনে। পাকিস্তান সরকারের যুগ্ম সচিব এম এ  রব এবং ডা. লুৎফর রহমান, সাভারে তাদের পারিবারিক সম্পত্তি থেকে, পাঁচ একর জায়গা দিয়েছিলেন এই হাসপাতালের জন্যে। সেইসাথে বঙ্গবন্ধু আরও ২৩ একর জমি অধিগ্রহণ করে দেন। ১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। 

স্বাধীনতার পরপরই নিজ দেশেই, ওষুধশিল্পের বিকাশ ঘটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। বিভিন্ন সরকারের কাছে বারবার গিয়েছিলেন নিজের স্বপ্নের কথা জানাতে। এসেছিলো মন্ত্রীত্বের সুযোগ। কিন্তু সাধাসিধে এই মানুষটি সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ওষুধ শিল্প আর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র নিয়েই দিন পার করেছেন। 

স্বপ্নের সেই ওষুধনীতি পাশ করতে, ১০ বছরের বেশি সময় লেগেছিলো তার। ১৯৮২ সালে পাশ হয় অধরা আইনটি। সেসময় বিদেশ থেকে আমদানি করা সাড়ে ৪ হাজার ওষুধ থেকে, প্রায় ২ হাজার ৮০০ ওষুধ নিষিদ্ধ করা হয়। বাংলাদেশে ওষুধ শিল্পের বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতির শুরুটা হয়েছিলো ডা. জাফরুল্লাহর এমন ওষুধনীতির সুবাদে। 

বর্তমানে মোট দেশীয় চাহিদার, ৯৫ শতাংশের বেশি ওষুধ তৈরি করছে বাংলাদেশ। সেই সাথে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে বিভিন্ন ওষুধ। আর এসবের পেছনে ছিলেন, জাফরুল্লাহ চৌধুরী। 

দেশের জন্য কাজের স্বীকৃতি হিসেবে, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ‘স্বাধীনতা দিবস পদক ও পুরস্কার’ পেয়েছেন  ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। আন্তর্জাতিক অঙ্গনের প্রসিদ্ধ ম্যাগসেসে’সহ, অনেক গুরুত্বপূর্ণ সম্মানজনক পুরস্কারও আছে তার অর্জনের খাতায়।



সম্পর্কিত

রাজধানীর খবর

জনপ্রিয়