পায়রা ৩৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে সরে যাচ্ছে সরকার। দেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
২০১৭ সালে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি ভিত্তিক পায়রা ৩৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্দেশ্যে জমি বরাদ্দ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও শেষ হয়েছিল।
তবে বৈশ্বিক মন্দার কারনে বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বেশ বেড়ে যাওয়ায় এই মেগাপ্রকল্প থেকে সরে আসছে সরকার।
বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ২০১৭ সালে জার্মান বহুজাতিক কোম্পানি সিমেন্স এজির সঙ্গে চুক্তি করে নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড।
এছাড়া ২০২০ সালে একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি এবং বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগকারী চীনের সিএমসির সঙ্গে আরেকটি বহুপক্ষীয় চুক্তির খসড়া তৈরি করা হয়।
তবে চুক্তিটি না করার বিদ্যুৎ বিভাগকে অনুরোধ জানিয়েছে নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি।
পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে ১২০০ মেগাওয়াট করে তিনটি পর্যায়ে মোট ৩৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু করোনা মহামারির কারনে গত দুই বছরে বাংলদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। তাই এইসময় প্রত্যাশা অনুযায়ী শিল্প এলাকা হয়নি।
ফলে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়েনি। তাই ২০৩০ সালের আগে আর নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজন নেই।
আবার বর্তমান সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের ফলে বিশ্বে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে, এলএনজির দাম বেড়ে গিয়েছে।
তাছাড়া বৈশ্বিক মন্দার এই পরিস্থিতিতে গ্যাস পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। এসব কারণেই ৩৬০০ মেগাওয়াট এলএনজি বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাতিল করা হচ্ছে।
আপাতত প্রথম পর্যায়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ভবিষ্যতের বিদ্যুতের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে বাকি দুটি ইউনিট পরবর্তীতে সুবিধাজনক সময়ে করা যেতে পারে।
শুধু পায়রা ৩৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, আগামী কয়েকবছরে বাংলাদেশে বেশকিছু এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
বর্তমান সময়ে বেসরকারি খাতে দুইটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।
এছাড়া আগামী বছরগুলোতে সরকারি এবং বেসরকারি কয়েকটি প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
সবমিলিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে যৌথ মালিকানায় বড় আকারের দুটি এবং সরকারিভাবে আরও সাতটি এলএনজি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল।
এলএনজি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছিল উৎপাদন খরচের কথা। কয়লার মাধ্যমে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৭ টাকা ৭৮ পয়সা খরচ পড়ে।
কিন্তু দেশি গ্যাসের সঙ্গে মিশ্রণ করে এলএনজি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে ইউনিটে খরচ হবে ৫.৭৭ থেকে ৬.২০ টাকা।
আবার এলএনজির তুলনায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বেশি জমি লাগে। এছাড়া এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম এবং এটি তুলনামূলক পরিবেশ বান্ধব।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরির্বতন ঘটেছে বিশ্ববাজারে। এলএনজি আমদানিতে এখন গড় খরচ বেড়েছে।
তাই এই ধরনের জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে এখন ২৮ থেকে ২৯ টাকা খরচ পড়বে।
বাধ্য হয়েই তাই প্রকল্পের অগ্রগতি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অবশ্য এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছু জানায়নি বিদ্যুৎ বিভাগ।
এলএনজি ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরকারের সরে আসার সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাতিলকৃত এলএনজি ভিত্তিক পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে মিলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করা যেতে পারে।
তাছাড়া পরিকল্পনায় থাকা অন্যান্য এলএনজি বিদ্যুৎকেন্দ্র বাদ দিয়েও নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিদ্যুৎকেন্দ্র করা উচিত।
এর ফলে বাড়তি এলএনজি আমদানি করতে হবে না, যা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে।