চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসেই ঢাকা-বরিশাল নৌপথে যুক্ত হতে যাচ্ছে বিলাসবহুল নৌযান এমভি সুন্দরবন-১৬।
রাজধানী থেকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নৌযাত্রাকে আরও নিরাপদ ও আরমদায়ক করতেই তৈরি করা হয়েছে উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর চারতলাবিশিষ্ট এই নৌপরিবহণ।
এটি সুন্দরবন নেভিগেশন কোম্পানির ১৬ তম সিরিজের একটি বিলাসবহুল যাত্রীবাহী লঞ্চ। তাদের বহরে নতুন সংযুক্ত হতে যাওয়া সুন্দরবন-১৬ এখন দেশের সব ধরনের যাত্রীবাহী লঞ্চগুলোর মধ্যে আকারে বৃহত্তম।
এর দৈর্ঘ্য ৩০০ ফুট এবং প্রস্থ ৫৪ ফুট। সম্ভাব্য যাত্রী ধারণ ক্ষমতা ১২০০ থেকে ১৫০০। তবে প্রয়োজনে ১০ হাজারের মতো যাত্রী বহন করা যেতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে। আধুনিক এই নৌযানে থাকছে ২০০ টিরও বেশী কেবিন।
লঞ্চটিতে রাখা হচ্ছে নানা ধরনের আধুনিক যাত্রী সেবা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিনগুলো ভিআইপি, সেমি ভিআইপি, ইকোনমি, ফ্যামিলি, সিঙ্গেল ও ডাবল এই ৬ টি শ্রেণিতে বিভক্ত।
প্রতি কেবিনে আলাদা করে থাকবে টেলিভিশন। এছাড়া বসার জন্য রয়েছে ২৫টি সোফার ব্যবস্থা। সোফায় শুয়ে শুয়েও যেতে পারবেন যাত্রীরা।
৪ তলা হওয়ায় রাখা হচ্ছে লিফটে উঠানামার সুবিধা। নিচ তলার ডেক থেকে চার তলা পর্যন্ত ৫ হাজারের অধিক এলইডি ও সাধারণ লাইট লাগানো হচ্ছে। লঞ্চে যুক্ত করা হয়েছে বেশ কয়েকটি জেনারেটর ইঞ্জিন।
সুন্দরবন কোম্পানির অন্যান্য লঞ্চের ক্যাপসুল ডিজাইন থেকে এটি বাহ্যিক কাঠামোর দিক দিয়ে আলাদা। প্রতিটি তলার নকশায় আনা হয়েছে নতুনত্ব।
ডেক ও কেবিনের সামনে রাখা হচ্ছে চলাচলের জন্য প্রশস্ত জায়গা, বিশাল বারান্দা, পর্যাপ্ত ওয়াশরুম এবং ক্যান্টিন। বারান্দার গ্রিলের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে নকশাখচিত ছোট ছোট চেয়ার।
কেবিন, বারান্দা ও সোফা ছাড়াও রাখা হয়েছে ভিআইপি জোন। সেখানে আলাদা করে বসা ও খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। আর সাধারণ যাত্রীদের জন্য ২ তলা ও ৩ তলায় রাখা হয়েছে ডাইনিং এর ব্যবস্থা।
এর বাইরেও ৩ তলায় একটি টি-স্টোর এবং ৪ তলায় একটি রেস্তারা রাখা হবে। সেখানে বসে খেতে খতে উপভোগ করা যাবে নদীর সৌন্দর্য। ৩ তলায় অজুর জন্য নির্দিষ্ট স্থানসহ রাখা হয়েছে নামাজের জন্য আলাদা ঘর।
লঞ্চে যুক্ত করা হয়েছে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন ইঞ্জিন। এছাড়াও, রাতে চলাচলের সুবিধার্থে রাখা হচ্ছে উন্নত প্রযুক্তির রাডার ও জিপিএস। নদীর চর ও পানির পরিমাণ বুঝার জন্য বসানো হচ্ছে ইকো সাউন্ডার।
প্রপেলারের সাহায্যে লঞ্চটি নদীতে চালনা করতে ব্যবহার করা হচ্ছে জাপানের বিখ্যাত ডিইজাটসুর ইঞ্চিন। আধুনিক যন্ত্রপাতির মধ্যে আরও রয়েছে ভিএইচএফ নামের যোগাযোগ স্থাপনকারী রেডিও।
নিচতলার ডেকের নিম্নভাগ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে, কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো ডেকে পানি প্রবেশ করবে না। সেক্ষেত্রে এটি ডুবে যাবে না, বরং ভেসে থাকতে পারবে।
যাত্রী সেবার উদ্দেশ্যে লঞ্চে রাখা হচ্ছে বেশ কয়েকজন প্রশিক্ষিত কর্মী। শুধু তাই নয়, যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে লঞ্চের কার্যক্রম নজরদারি করতে থাকছে সার্বক্ষণিক সিসি টিভি ক্যামেরা।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় কর্তৃক নতুন লঞ্চের সার্ভে ও ফিটনেস সনদ পেয়ে গেলে আগামী এক মাসের মধ্যে ঢাকা-বরিশাল নৌপথে যুক্ত হবে এটি। এর মাধ্যমে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হবে।
তবে বিপরীত সম্ভাবনার কথাও চিন্তা করা হচ্ছে। কারণ পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর সড়ক পথে ঢাকা থেকে বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোতে যাতায়াত অনেকাংশে সহজতর হয়ে যাওয়ায়, এই পথে যাত্রীবাহী নৌযানের চাহিদা কমে গেছে।
তার উপর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এসময় যাত্রী সংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ লঞ্চের ভাড়া আগের তুলনায় বেড়ে গেছে ৩০ শতাংশ।
ফলে নৌ অপেক্ষা সেতু পারাপার হয়ে সড়কপথকেই সুবিধাজনক মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলস্বরূপ, লঞ্চে পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
এই পরিস্থিতিতে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে দেশের বৃহত্তম নৌযান এমভি সুন্দরবন-১৬। সুন্দরবন নেভিগেশন কোম্পানির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন,
লঞ্চটি অনেক আগেই তৈরি করা ছিল। তাই ফেলে রাখার চাইতে নৌপথে ব্যবহার করাই যথার্থ মনে করছেন তারা।
এমন চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে এই রুটে লঞ্চের চাহিদা কমে গেলেও সুন্দরবন-১৬ তে যে ধরনের সুযোগ সুবিধার রাখা হয়েছে, তাতে এটি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছে কর্তৃপক্ষ।