বাংলাদেশ
ঘরছাড়া করেছিল পরিবার, সমাজ ত্যাগ করলেও ছাড়েনি ভালোবাসা
.jpg)
বাসমতি রানী রবিদাস ও রামনারায়ণ রবিদাস । ছবি: সংগৃহীত
চা–বাগানের সরু পথ। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি মাটিতে নামেনি। কুয়াশার ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছেন এক নারী, হাতে ধরা আরেকজনের হাত। তিনি পথ দেখান, আর যিনি তাঁর হাত ধরে হাঁটছেন, তিনি জন্মান্ধ। পৃথিবী দেখেন না চোখে, দেখেন অনুভবে।
এই হাত ধরা শুধু পথ চলার নয়; ২৫ বছরের এক সংসার, এক ভালোবাসা আর এক জীবনের দায় কাঁধে নেওয়ার প্রতীক।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার পালকিছড়া চা–বাগানের ছোট্ট টিনের ঘরে থাকেন বাসমতি রানী রবিদাস ও তাঁর স্বামী রামনারায়ণ রবিদাস। এলাকায় বাসমতিকে অনেকে ‘পাগলি’ বলে ডাকেন। কিন্তু সেই ‘পাগলিই’ হয়ে উঠেছেন এক জন্মান্ধ মানুষের চোখ, ভরসা আর জীবনসঙ্গী।
প্রেম, যার মূল্য ছিল ঘরছাড়া
চা–বাগানে কাজের ফাঁকে ফাঁকে কথা হতো তাঁদের। একসময় সেই কথাই রূপ নেয় ভালোবাসায়।
বাসমতি বলেন, ‘ওর সঙ্গে কথা বললে মন ভরে যেত। কিন্তু আমার পরিবার কেউ তাকে মেনে নেয়নি। সবাই আমাকে পাগলি বলত। একদিন ঘর থেকেই বের করে দিল।’
আশ্রয়ের খোঁজে তিনি যান রামনারায়ণের কাছে। কিন্তু সেখানেও ঠাঁই হয়নি।
রামনারায়ণ বলেন, ‘বাবা বললেন তোমার জন্মের ভাগী আমি, কিন্তু কর্মের ভাগী না। তারপর আমাকেও বাড়ি থেকে বের করে দিলেন।’
দুজনেই হয়ে গেলেন ঘরছাড়া শুধু ভালোবাসার অপরাধে।
গাছতলায় শুরু সংসার
প্রথম কয়েক মাস কেটেছে বাজারের গাছতলায়। ভিক্ষায় পাওয়া কাপড়েই দিন চলত। পরে এক দয়ালু মানুষ নিজের বারান্দায় আশ্রয় দেন।
বাসমতির দিন শুরু হতো স্বামীকে দিয়ে নাস্তা তৈরি, স্নান করানো, পোশাক পরানো। তারপর তাঁর হাত ধরে ভিক্ষায় বের হওয়া।
হেসে বাসমতি বলেন, ‘আমার মতো পাগলির কথা কেউ না শুনলেও, একজন তো শুনে।’

বাসমতি রানী রবিদাস ও তাঁর স্বামী রামনারায়ণ রবিদাস
একে অন্যের ভরসা
রামনারায়ণের প্রথম স্ত্রী প্রায় ৩০ বছর আগে সন্তান প্রসবের সময় মারা যান। এরপর তিনি হয়ে পড়েন একা ও ছন্নছাড়া। হঠাৎ দেখা পান বাসমতির।
‘আমার মতো অন্ধ মানুষকে আবার কেউ ভালোবাসবে, ভাবতেই পারিনি,’ বলেন তিনি।
স্ত্রীর কথা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠ কেঁপে ওঠে। ‘ওর কাঁধে হাত রেখেই চলি। ওর চোখই আমার ভরসা।’
অভাবের ভেতর সন্তান
বিয়ের এক বছরের মাথায় জন্ম নেয় প্রথম সন্তান, পরে আরেক পুত্র। তখন চরম অভাব।
বাসমতি বলেন, ‘অনেক সময় খাবার অভাবে বুকে দুধ হতো না।’ প্রতিবেশীরা কখনো দুধ খাইয়ে দিতেন, কখনো সন্তান উপোষেই ঘুমিয়ে পড়ত।
তবু মানুষের দয়া তাঁদের বাঁচিয়ে রেখেছে। কেউ শিশুকে দেখে খাবার দিত, কেউ খোঁজ নিত।
ভিক্ষা ছাড়ার স্বপ্ন
ভিক্ষার থালা নামিয়ে রাখার স্বপ্ন ছিল দুজনেরই। এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে একটি অটোরিকশা কেনেন। পরিকল্পনা ছিল, ছেলে চালাবে, সংসার চলবে।
কিন্তু স্বপ্নটা টিকল মাত্র ছয় মাস।
গত ৩১ ডিসেম্বর ভোরে ঘুম ভেঙে দেখেন, তালা ভাঙা অটোরিকশা নেই।
রামনারায়ণের কণ্ঠ ভেঙে যায়। ‘ভাবছিলাম আর ভিক্ষা করতে হবে না… কিন্তু ভগবান সে সুখও দিল না।’
পাশে দাঁড়িয়ে বাসমতি বলেন, ‘এই অটোরিকশাটাই আছিল ভরসা। চোরে মরা মানুষরে মারিয়া গেল।’
অপমানের ভেতরেও অটুট ভালোবাসা
স্বজনদের অপমান, সমাজের তাচ্ছিল্য সবই সহ্য করেছেন তাঁরা।
প্রতিবেশী সুমন যাদব বলেন, ‘এত অভাব, অপমান সত্ত্বেও শুধু ভালোবাসার জন্য সংসারটা ২৫ বছর টিকে আছে। বাসমতিকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।’
আজও ভোর হলে বাসমতি স্বামীর হাত ধরেন, পথ দেখান।
চোখে দেখতে পান না রামনারায়ণ, কিন্তু ভালোবাসা অনুভব করেন।
আর বাসমতি সমাজের চোখে ‘পাগলি’, কিন্তু এক জন্মান্ধ মানুষের জীবনে তিনি আলো হয়ে আছেন।
জনপ্রিয়
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
হামে শিশুমৃত্যু ৫১২, একদিনে মারা গেছে আরও ১৩ শিশু
দেশে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১২ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ১৩২ শিশু। শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

পল্লবীতে শিশু হত্যা: সামাজিক মাধ্যমে কেন আলোচনায় ‘দ্য ডিসাপেয়ারেন্স অব উইলি বিংহাম’?
রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছর বয়সি শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। এই নৃশংসতার পরিপ্রেক্ষিতে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি যখন তুঙ্গে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ২০১৫ সালের বহুল আলোচিত অস্ট্রেলিয়ান স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিসাপেয়ারেন্স অব উইলি বিংহাম’ (The Disappearance of Willie Bingham)। মাত্র ১২ মিনিটের এই মনস্তাত্ত্বিক সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন ম্যাথু রিচার্ড।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাল জামায়াতে ইসলামী
ধর্ষকের প্রকাশ্য শাস্তি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। শুক্রবার দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে এ প্রতিক্রিয়া জানান।

রাত বাড়লেই সুনামগঞ্জ শহরে চুরির আতঙ্ক, অতিষ্ঠ বাসিন্দারা
সুনামগঞ্জ শহরে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলেছে চুরির ঘটনা। বাসাবাড়ির পাশাপাশি সরকারি, আধাসরকারি ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানেও হানা দিচ্ছে চোরচক্র। চিহ্নিত চিচকে চোরদের দৌরাত্ম্যে শহরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়ছে।









