কলাম


আমরা যেমন বাংলাদেশ চাই: পরাবাস্তবতা নয়, কাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা


দূরবিন ডেস্ক

দূরবিন ডেস্ক

প্রকাশিত:২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার

আমরা যেমন বাংলাদেশ চাই: পরাবাস্তবতা নয়, কাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা

ছবি: দূরবিন নিউজ


বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের স্বপ্নগুলো প্রায়ই “পরাবাস্তব” বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। বলা হয় এ দেশে সচ্ছতা সম্ভব নয়, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব, জবাবদিহিতা কাগুজে কথা। কিন্তু বিশ্ব ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। আজ যেসব দেশ সুশাসনের উদাহরণ, তারাও একসময় দুর্নীতি, অদক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার মধ্য দিয়েই গেছে। পার্থক্যটা হয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নাগরিক চাপের জায়গায়। তাই প্রশ্নটি “বাংলাদেশে হবে কি না” নয়, প্রশ্ন হলো আমরা আদৌ তা চাই কি না এবং কতটা গুরুত্ব দিয়ে চাই।

 

সচ্ছতা (Transparency) ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। যখন সরকারি সিদ্ধান্ত, ব্যয় ও নিয়োগ প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ থাকে, তখন রাষ্ট্র নাগরিকের আস্থা হারায়। সুইডেন বিশ্বের সবচেয়ে স্বচ্ছ রাষ্ট্রগুলোর একটি। সেখানে Freedom of Information Act অনুযায়ী, একজন সাধারণ নাগরিকও সরকারি নথি দেখার অধিকার রাখে। মন্ত্রীদের ই-মেইল পর্যন্ত নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। বাংলাদেশে আমরা সচ্ছতার কথা বলি, কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রীয় তথ্য পাওয়া এখনও কঠিন। তথ্য অধিকার আইন থাকলেও তার প্রয়োগ দুর্বল। অথচ সচ্ছতা কোনো বিলাসিতা নয় এটি দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার প্রথম শর্ত।

 

জবাবদিহিতা (Accountability) না থাকলে ক্ষমতা স্বেচ্ছাচারে পরিণত হয়। যুক্তরাজ্যে একজন মন্ত্রী সংসদে ভুল তথ্য দিলে তাকে পদত্যাগ করতে হয়—এটি কেবল রাজনৈতিক সংস্কৃতি নয়, এটি একটি নৈতিক মানদণ্ড। ২০২২ সালে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নিয়মভঙ্গের অভিযোগ উঠলে তদন্ত শুরু হয়, যদিও তিনি ক্ষমতাধর ছিলেন। বাংলাদেশে ক্ষমতার জবাবদিহিতা এখনও দুর্বল। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দায় ব্যক্তির ওপর পড়ে না, পড়ে “সিস্টেম”-এর ওপর। ফলে ভুল হলেও কেউ দায় নেয় না। জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা মানে শাস্তি নয়; মানে দায়িত্ব স্বীকারের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

 

দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়তে শুধু কঠোর আইন যথেষ্ট নয় প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। সিঙ্গাপুর এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ। সেখানে Corrupt Practices Investigation Bureau (CPIB) প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের অধীনে থাকলেও কার্যত স্বাধীন। কোনো মন্ত্রী বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দুর্নীতিতে জড়িত হলে ছাড় পায় না এমন নজির বহু রয়েছে। বাংলাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা হয়, কিন্তু তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান তখনই কার্যকর হয়, যখন তা নিরপেক্ষ এবং ধারাবাহিক হয়।

 

অনেকের কাছে সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসেব চাওয়া “অতিরিক্ত” মনে হয়। অথচ এটি উন্নত গণতন্ত্রে একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের Annual Asset Disclosure বাধ্যতামূলক। দক্ষিণ কোরিয়ায় সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদ প্রকাশ্যে না আনলে শাস্তির বিধান আছে। বাংলাদেশে সম্পদ বিবরণী দেওয়া হয়, কিন্তু তা কতটা যাচাই হয় সেটাই মূল প্রশ্ন। সম্পদের হিসেব চাওয়া কাউকে অপমান করা নয়; এটি জনগণের অর্থ ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতার শর্ত।

 

ডিজিটালাইজেশন কেবল আধুনিকতা নয়, এটি দুর্নীতি কমানোর কার্যকর হাতিয়ার। এস্তোনিয়া বিশ্বের অন্যতম ডিজিটাল রাষ্ট্র। সেখানে নাগরিকরা অনলাইনে ভোট দেয়, ট্যাক্স দেয়, এমনকি কোম্পানি রেজিস্ট্রেশনও কয়েক মিনিটে শেষ হয়। ফলে দালাল, ঘুষ ও অপ্রয়োজনীয় মানবিক হস্তক্ষেপ কমে যায়। বাংলাদেশে ডিজিটাল সেবার অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই “ডিজিটাল মুখোশের ভেতরে পুরনো ব্যবস্থা” রয়ে গেছে। প্রকৃত ডিজিটাল রাষ্ট্র মানে প্রক্রিয়ার সরলীকরণ, কেবল অনলাইন ফর্ম নয়।

 

ন্যায়পাল (Ombudsman) একটি রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। নরওয়েতে ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত শক্তিশালী। একজন সাধারণ নাগরিকও প্রশাসনের বিরুদ্ধে ন্যায়পালের কাছে অভিযোগ জানাতে পারে এবং সেই অভিযোগের আইনগত গুরুত্ব থাকে। বাংলাদেশে ন্যায়পাল আইন থাকলেও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি আজও অনুপস্থিত। এটি একটি বড় পরাবাস্তবতা আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। কার্যকর ন্যায়পাল মানে প্রশাসনের ওপর একটি নৈতিক নজরদারি।

 

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) শক্তিশালী হতে পারে কেবল তখনই, যখন তার কার্যকর স্বাধীনতা থাকে। হংকংয়ের Independent Commission Against Corruption (ICAC) একসময় ভয়াবহ দুর্নীতিগ্রস্ত শহরকে কয়েক দশকে শৃঙ্খলিত করেছে। কারণ, সেখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রায় নেই। বাংলাদেশে দুদকের আইনগত ক্ষমতা থাকলেও বাস্তব স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ। কোনো প্রতিষ্ঠান কাগজে শক্তিশালী হলেও, বাস্তবে দুর্বল হলে নাগরিক আস্থা তৈরি হয় না।

 

সময় ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের সবচেয়ে অবহেলিত উপাদান। জাপানে সময়ানুবর্তিতা একটি সামাজিক চুক্তি। ট্রেন কয়েক সেকেন্ড দেরি করলে কর্তৃপক্ষ দুঃখ প্রকাশ করে। সরকারি অফিসে সময় নষ্ট করা সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশে সময় নষ্ট যেন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি। ফাইল আটকে থাকে, সভা শুরু হয় দেরিতে, নাগরিক সেবা পেতে দিনের পর দিন লাগে। সময়ের অপচয় মানেই অর্থনৈতিক ক্ষতি ও নাগরিক ভোগান্তি।

 

আমরা যে বাংলাদেশ চাই তা কোনো কল্পলোক নয়। সুইডেন, সিঙ্গাপুর, এস্তোনিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়া একদিনে এই অবস্থানে পৌঁছায়নি। তারা পৌঁছেছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও নাগরিক চাপের মাধ্যমে। বাংলাদেশের প্রশ্ন তাই সক্ষমতার নয়, প্রশ্ন অগ্রাধিকারের। আমরা কি সত্যিই সচ্ছতা চাই, নাকি কেবল বক্তৃতায় চাই? জবাবদিহিতা চাই, নাকি সুবিধাজনক নীরবতা?

 

একটি রাষ্ট্র বদলায় তখনই, যখন নাগরিকরা পরাবাস্তব স্বপ্ন নয় বাস্তব দাবি তুলতে শেখে। আমরা যেমন বাংলাদেশ চাই, তা কেবল আশা নয়; এটি একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক দাবি।

 

  • বি. এম. হাসান মাহমুদ, লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

 


সম্পর্কিত

কলামবাংলাদেশ

জনপ্রিয়


কলাম থেকে আরও পড়ুন

কোনো সম্পর্কিত খবর পাওয়া যায়নি