২০২৫ সালের ২ এপ্রিল বিশ্বের ১৫৭টি দেশের পণ্যে বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচনী প্রচারণায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ পদক্ষেপ নেন তিনি। ওই দিনকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাধীনতা দিবস’ আখ্যা দিয়ে দাবি করেন, এত দিন অন্যান্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে বাণিজ্যে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে—এই শুল্কের মধ্য দিয়ে তার অবসান ঘটবে।
তবে সাম্প্রতিক এক রায়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের ঘোষিত পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করেছে। আদালতের রায়ের পরও ট্রাম্প প্রশাসন পিছু হটার ইঙ্গিত দেয়নি; বরং বিকল্প আইনি কাঠামো ব্যবহার করে নতুন করে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
কী ছিল পাল্টা শুল্ক নীতি
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বহু দেশের প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, ভারতসহ একাধিক উন্নয়নশীল দেশ রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে এগিয়েছে। কিন্তু এসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য-বাণিজ্যে বড় ঘাটতি রয়েছে—এটিকে ট্রাম্প প্রশাসন ‘অন্যায্য’ বলে চিহ্নিত করে।
২ এপ্রিলের ঘোষণায় বলা হয়, যেসব দেশ মার্কিন পণ্যে যে হারে শুল্ক আরোপ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রও তাদের পণ্যে তার আনুপাতিক—অনেক ক্ষেত্রে অর্ধেক—হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে। উদাহরণ হিসেবে চীনের ক্ষেত্রে ৬৭ শতাংশের বিপরীতে ৩৪ শতাংশ, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ৭৪ শতাংশের বিপরীতে ৩৭ শতাংশ এবং ভারতের ক্ষেত্রে ৫২ শতাংশের বিপরীতে ২৬ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণের কথা বলা হয়। পাশাপাশি সব দেশের জন্য ন্যূনতম ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়।
পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পৃথক আলোচনার মাধ্যমে কিছু সমন্বয় করা হয়। বাংলাদেশের সঙ্গেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
আদালতের রায় ও নতুন কৌশল
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের বাইরে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনসহ অন্যান্য আইনি পথ ব্যবহার করে শুল্কনীতি বহাল রাখা হবে। প্রশাসন ‘ধারা ১২২’ ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সাময়িক শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করছে, যা ১৫০ দিন পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, বিকল্প ধারায় শুল্ক আরোপের মাধ্যমে সরকারের আয় প্রায় অপরিবর্তিত রাখা সম্ভব হবে বলে তারা মনে করছেন। যদিও নতুন আইনি পথে অগ্রসর হতে তদন্ত, শুনানি ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে প্রশাসনকে।
শুল্কের অর্থ ফেরত—বাস্তবতা কী
গত বছর শুল্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আয় ছিল আনুমানিক ২৪০ থেকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার। গবেষণা অনুযায়ী, এর প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যয় শেষ পর্যন্ত মার্কিন কোম্পানি ও ভোক্তাদের ওপর বর্তেছে। সম্ভাব্য অর্থ ফেরতের প্রশ্ন উঠলেও তা শিগগির বাস্তবায়ন হবে—এমন সম্ভাবনা কম বলেই ধারণা বিশ্লেষকদের।
অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ ও বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া
অর্থনীতিবিদ ও ইউএনডিপির মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তরের সাবেক পরিচালক সেলিম জাহান মনে করেন, ট্রাম্পের নীতি মূলত দ্বিপক্ষীয় ও অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদনির্ভর। তাঁর ভাষায়, বহুপাক্ষিক বিধিবদ্ধ বাণিজ্যব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে শুল্ক আরোপের এই প্রবণতা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাড়াবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর রপ্তানি বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর বাজারে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
‘বাণিজ্যঘাটতি’ বিতর্ক
ট্রাম্প প্রশাসন পণ্য-বাণিজ্যের ঘাটতিকে কেন্দ্র করে শুল্কনীতি জোরদার করলেও সমালোচকেরা বলছেন, সেবা-বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বড় উদ্বৃত্ত রয়েছে—যা প্রায়ই আলোচনায় আনা হয় না। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেবা-বাণিজ্যের উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯৩ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়নের ধাপ অনুযায়ী অর্থনীতির কাঠামো বদলায়। যুক্তরাষ্ট্র এখন প্রযুক্তি ও সেবানির্ভর অর্থনীতিতে অগ্রসর। ফলে কেবল পণ্য-বাণিজ্যের ঘাটতির ভিত্তিতে শুল্কযুদ্ধের যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ।
বাংলাদেশের সামনে করণীয়
বিশ্ববাণিজ্যে এই অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশকে বিকল্প বাজার ও আঞ্চলিক বাণিজ্যচুক্তির দিকে মনোযোগী হতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সম্ভাবনাময় বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো, বহুপাক্ষিক কৌশল জোরদার করা এবং এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী প্রস্তুতি শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।
পরিস্থিতি যেদিকেই মোড় নিক, বৈশ্বিক শুল্কসংকট যে নতুন করে অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছে—তা নিয়ে সন্দেহ নেই। বাংলাদেশসহ রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য কৌশলগত ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।