এক্সক্লুসিভ


অর্থনীতিবিদ মুহিতের বর্ণাঢ্য জীবন


হেড অফ ডিজিটাল মিডিয়া

শামসুল আলম

প্রকাশিত:৩০ এপ্রিল ২০২২, ১২:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার

অর্থনীতিবিদ মুহিতের বর্ণাঢ্য জীবন

নিয়াজ মোর্শেদ: 


বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিক, লেখক, গবেষক, সরকারি কর্মকর্তা, মন্ত্রী, ও পরিবেশবিদসহ নানা পরিচয়ে গৌরবোজ্জ্বল আবুল মাল আবদুল মুহিত। বাংলাদেশ রাজনৈতিক অঙ্গণের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন তিনি। তার চলে যাওয়ায় দেশের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অঙ্গণে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে মত দিয়েছেন অনেকেই।  


আবুল মাল আব্দুল মুহিত ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন সিলেট জেলা মুসলিম লীগের নেতা আবু আহমদ আবদুল হাফিজ ও মা সৈয়দ শাহার বানু চৌধুরীর দ্বিতীয় ছেলে মুহিত। তার বাবা-মা দু’জনই রাজনীতি ও সমাজসেবায় সক্রিয় ছিলেন। মুহিতের ছোট ভাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন।


সংস্কৃতিমান পারিবারিক আবহে বেড়ে ওঠা মুহিত কৈশোরেই সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় ছিলেন বেশ মনোযোগী। জীবনের শেষ বয়সেও তার সৃজনশীল চর্চা থেমে ছিল না। দেশের বিভিন্ন সংকটে অর্থনীতি, সমাজনীতি নিয়ে দিয়ে গেছেন নিজের অভিজ্ঞ মতামত।


শিক্ষা জীবন: 


ছাত্র জীবন থেকে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন তিনি। মুহিত ১৯৪৮ সালে স্কুলছাত্র হিসেবে প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৪৯ সালে সিলেট সরকারি পাইলট হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতকার্য হন। ১৯৫১ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। 


এরপর ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স করার পর অক্সফোর্ড ও হার্ভার্ডে উচ্চশিক্ষা নেন মুহিত। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার পর তখনকার পাকিস্তান এবং পরে স্বাধীন বাংলাদেশে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।


চাকরি ও রাজনৈতিক জীবন: 


আবুল মাল আব্দুল মুহিত ১৯৭২ সালে পরিকল্পনা সচিব নিযুক্ত হন । তবে এই দায়িত্ব গ্রহণ না করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পরামর্শে ওয়াশিংটন দূতাবাসে ইকোনোমিক মিনিস্টারের দায়িত্ব নেন। ১৯৭৪ সালে তিনি এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকে নির্বাহী পরিচালক পদে নিযুক্ত হন। এ পর্যন্ত তিনি একমাত্র বাংলাদেশি যিনি এ পদে আসীন হয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালে তিনি অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগে সচিব পদে নিযুক্ত হন। ১৯৮১ সালে চাকরির ২৫ বছর পূর্তিকালে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে তিনি স্বেচ্ছায় সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন।  


আবদুল মুহিত পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের চিফ ও উপ-সচিব ছিলেন। ওয়াশিংটন দূতাবাসের তিনি প্রথম কূটনীতিবিদ, যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১৯৭১ -এর জুন মাসে পাকিস্তানের পক্ষ পরিত্যাগ করে বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রদর্শন করেন। 


৮১ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে তিনি অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ হিসেবে ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও ইফাদে কাজ শুরু করেন। ১৯৮২-৮৩ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর তিনি বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন।  


১৯৮৪-৮৫ সালে মুহিত প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং ফেলো ছিলেন। ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনে সম্পৃক্ত হয়ে দেশের সুশীল সমাজের একজন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন।


বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনেও তিনি একজন পথিকৃৎ। তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। ২০০১ সালের অগাস্টে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ২০০২ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নিযুক্ত হন। ২০০৯ সালে সিলেট-১ আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন।  


২০১৪ সালে সিলেট-১ আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি আবারও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। দক্ষতা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে আর নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেন।  


মুহিত অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ বিশ্বের রোল মডেল হিসেবে পরিচিতি পায়। বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতিটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটি মুহিতের সময় কালে না হলেও তার সময়কার অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তিতে এ স্বীকৃতি মিলেছে। 


সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৮২-৮৩, ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছর ২০০৯-১০, ২০১০-১১, ২০১১-১২, ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭, ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯ অর্থবছর সহ সর্বমোট ১২ বার বাজেট পেশ করেন। 


আবুল মাল আব্দুল মুহিত মুক্তিযুদ্ধ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ইতিহাস, জনপ্রশাসন এবং রাজনীতি নিয়ে ৩০টির অধিক বই লিখেছেন মুহিত। জাতীয় পর্যায়ে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মুহিতকে ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কারে’ ভূষিত করে সরকার।  


আবুল মাল আব্দুল মুহিত ২০২২ সালে ২৯ এপ্রিল রাত ১২.৫০ মিনিটে রাজধানীর ইউনাউটেড হাসপাতালে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। 


জনপ্রিয়