আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে দেওয়া এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ‘ইনকিলাব’ শব্দ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান বাংলা ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বাংলা ভাষাকে মায়ের ভাষা হিসেবে সম্মান করতে হলে এ ধরনের স্লোগান গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”

তিনি আরও বলেন, “‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বা ইনকিলাব মঞ্চের মতো বিষয়গুলো বাংলার অংশ নয়; এগুলো সেই ভাষার অংশ, যারা একসময় বাংলা ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল।”

মন্ত্রীর এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সমর্থন ও সমালোচনা দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াই দেখা যায়। কেউ ভাষার আবেগের প্রশ্ন তুলেছেন, কেউ আবার শব্দের উৎস ও ভাষার ইতিহাস নিয়ে পাল্টা যুক্তি দিয়েছেন।

citytouch 728-X-90

ভাষাবিদদের মতে, বাংলা কোনো একক উৎসের ভাষা নয়; এটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠা বহুসূত্রীয় ভাষা। সংস্কৃত, প্রাকৃত, আরবি, ফার্সি, উর্দুসহ বিভিন্ন ভাষা থেকে অসংখ্য শব্দ বাংলায় প্রবেশ করেছে। সময়ের সঙ্গে সেসব শব্দ দৈনন্দিন ব্যবহারের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠেছে।

উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই উল্লেখ করা হয় কলম, ওকিল, ইশারা, আদালত, হিসাব, দুনিয়া এসব শব্দের উৎস আরবি হলেও সেগুলো এখন বাংলা ভাষার স্বীকৃত ও বহুল ব্যবহৃত শব্দ।

‘ইনকিলাব’ শব্দটিও আরবি উৎসের, যার অর্থ পরিবর্তন বা বিপ্লব। ফলে প্রশ্ন উঠেছে শব্দের উৎস কি তার ভাষাগত পরিচয় নির্ধারণ করে, নাকি দীর্ঘদিনের ব্যবহার ও গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যমে সেটি নতুন ভাষার অংশ হয়ে যায়?

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক কেবল একটি স্লোগানকে ঘিরে নয়; বরং ভাষা, ইতিহাস ও রাজনৈতিক স্মৃতির সম্পর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। ভাষা যেমন আবেগের বিষয়, তেমনি এটি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত ও সমৃদ্ধ হওয়া একটি সামাজিক বাস্তবতাও।

বাংলা ভাষা তার ইতিহাসজুড়ে বহুসংস্কৃতির প্রভাব গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হয়েছে। ফলে কোনো শব্দের উৎস নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে ভাষা দিবসের মতো আবেগঘন দিনে এমন মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। এখন প্রশ্ন ভাষার বিশুদ্ধতা কি উৎসে, নাকি ব্যবহারে? বিতর্ক চলছেই।