মতামত


‘ইনকিলাব’ নিয়ে বিতর্ক: কলম-ওকিল-ইশারাও কি তবে বাংলা নয়?


ভোলা, মনপুরা প্রতিনিধি

আব্দুর রহমান সোয়েব

প্রকাশিত:২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:০৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার

‘ইনকিলাব’ নিয়ে বিতর্ক: কলম-ওকিল-ইশারাও কি তবে বাংলা নয়?

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে দেওয়া এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ‘ইনকিলাব’ শব্দ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান বাংলা ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বাংলা ভাষাকে মায়ের ভাষা হিসেবে সম্মান করতে হলে এ ধরনের স্লোগান গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”

 

তিনি আরও বলেন, “‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বা ইনকিলাব মঞ্চের মতো বিষয়গুলো বাংলার অংশ নয়; এগুলো সেই ভাষার অংশ, যারা একসময় বাংলা ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল।”

 

মন্ত্রীর এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সমর্থন ও সমালোচনা দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াই দেখা যায়। কেউ ভাষার আবেগের প্রশ্ন তুলেছেন, কেউ আবার শব্দের উৎস ও ভাষার ইতিহাস নিয়ে পাল্টা যুক্তি দিয়েছেন।

 

ভাষাবিদদের মতে, বাংলা কোনো একক উৎসের ভাষা নয়; এটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় গড়ে ওঠা বহুসূত্রীয় ভাষা। সংস্কৃত, প্রাকৃত, আরবি, ফার্সি, উর্দুসহ বিভিন্ন ভাষা থেকে অসংখ্য শব্দ বাংলায় প্রবেশ করেছে। সময়ের সঙ্গে সেসব শব্দ দৈনন্দিন ব্যবহারের স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠেছে।

 

উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই উল্লেখ করা হয় কলম, ওকিল, ইশারা, আদালত, হিসাব, দুনিয়া এসব শব্দের উৎস আরবি হলেও সেগুলো এখন বাংলা ভাষার স্বীকৃত ও বহুল ব্যবহৃত শব্দ।

 

‘ইনকিলাব’ শব্দটিও আরবি উৎসের, যার অর্থ পরিবর্তন বা বিপ্লব। ফলে প্রশ্ন উঠেছে শব্দের উৎস কি তার ভাষাগত পরিচয় নির্ধারণ করে, নাকি দীর্ঘদিনের ব্যবহার ও গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যমে সেটি নতুন ভাষার অংশ হয়ে যায়?

 

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক কেবল একটি স্লোগানকে ঘিরে নয়; বরং ভাষা, ইতিহাস ও রাজনৈতিক স্মৃতির সম্পর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। ভাষা যেমন আবেগের বিষয়, তেমনি এটি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত ও সমৃদ্ধ হওয়া একটি সামাজিক বাস্তবতাও।

 

বাংলা ভাষা তার ইতিহাসজুড়ে বহুসংস্কৃতির প্রভাব গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হয়েছে। ফলে কোনো শব্দের উৎস নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে ভাষা দিবসের মতো আবেগঘন দিনে এমন মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। এখন প্রশ্ন ভাষার বিশুদ্ধতা কি উৎসে, নাকি ব্যবহারে? বিতর্ক চলছেই।


সম্পর্কিত

মতামতইনকিলাববিতর্ক

জনপ্রিয়


মতামত থেকে আরও পড়ুন

কেন অনলাইনে বিপুল ভোটে জয়ী হয় জামায়াতে ইসলাম? শুধুই কি ‘বট আইডি’, নাকি ভিন্ন কিছু?

‘বট’ আইডির বিষয়টি এখন বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেক নেটিজেনরাই জানেন, এবং ‘বট’ বলে ট্যাগ করেন, কিন্তু এর বাইরের কারণগুলো নিয়েই আলোচনা বেশি জরুরি এখন। আসলে এখানে জড়িত আরও বেশ কিছু গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা।

জেন-জির অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পালাবদল, নির্বাচনে ফিরছে কি পুরোনো রাজনীতি

জেন-জির নেতৃত্বে রাস্তায় নেমে এসেছিল একটি প্রজন্ম। তাদের কণ্ঠে ছিল পরিবর্তনের দাবি, চোখে ছিল নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। সেই জেন–জির নেতৃত্বেই সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে দীর্ঘদিনের শাসক শেখ হাসিনার। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি প্রজন্ম আশা করেছিল রাজনীতিতে মৌলি

ক্ষমতার ভারসাম্যনীতিঃ বাংলাদেশে আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের অসাম্য অবস্থান

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মৌলিক স্তম্ভ হলো ক্ষমতার ভারসাম্যনীতি। মন্টেস্কিয়ুর তত্ত্ব অনুযায়ী রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান অঙ্গ আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে, কিন্তু একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যে রাখবে। এই নীতির উদ্দেশ্য

ভোটের আগে ডিজিটাল বিভ্রান্তি: বট, ফেক আইডি ও ভুয়া জরিপ

সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে জামায়াত-শিবিরপন্থী অ্যাকাউন্ট, পেজ ও গ্রুপগুলোর অস্বাভাবিক সক্রিয়তা। পোস্টের পর পোস্ট, মন্তব্যের ঢল, লাইক ও শেয়ার দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে তারা কি ভোটের রাজনীতিতেও এগিয়ে? বাস্তবতা ভিন্ন। সোশ্যাল মি