মতামত


ক্ষমতার ভারসাম্যনীতিঃ বাংলাদেশে আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের অসাম্য অবস্থান


দূরবিন ডেস্ক

দূরবিন ডেস্ক

প্রকাশিত:০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার

ক্ষমতার ভারসাম্যনীতিঃ বাংলাদেশে আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের অসাম্য অবস্থান

ছবি: সংগৃহীত


গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মৌলিক স্তম্ভ হলো ক্ষমতার ভারসাম্যনীতি (Separation of Powers)। মন্টেস্কিয়ুর তত্ত্ব অনুযায়ী রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান অঙ্গ আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে, কিন্তু একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যে রাখবে। এই নীতির উদ্দেশ্য একটাই: ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঠেকানো এবং নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের সংবিধানেও এই নীতির স্বীকৃতি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো সংবিধানে ঘোষিত স্বাধীনতার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাস্তব চর্চার মধ্যে বিস্তর ফারাক। আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য নয়; বরং নির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র প্রভাব ও প্রাধান্যই আজ বাংলাদেশের ক্ষমতাকাঠামোর মূল বৈশিষ্ট্য।


বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।” আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের (৬৫ অনুচ্ছেদ), নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার (৫৫ অনুচ্ছেদ) এবং বিচারিক ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের (৯৪ অনুচ্ছেদ) ওপর ন্যস্ত। কাগজে-কলমে এটি একটি পরিপূর্ণ ক্ষমতার বিভাজন ব্যবস্থা। কিন্তু বাস্তবে এই তিন অঙ্গের সম্পর্ক সহযোগিতামূলক নয়, বরং অসম ও নির্ভরশীল।


গণতন্ত্রে সংসদ হওয়া উচিত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক মঞ্চ—যেখানে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাহীকে প্রশ্ন করবে, জবাবদিহির আওতায় আনবে এবং আইন প্রণয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে। কিন্তু বাংলাদেশে সংসদ ক্রমেই পরিণত হয়েছে নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের রাবার স্ট্যাম্পে। 


১. সংসদের কার্যকর বিরোধী দল নেই, একাধিক সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণমূলকতার ঘাটতির ফলে সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে কার্যকর বিতর্ক, প্রশ্নোত্তর ও নীতিগত বিরোধিতা প্রায় নেই বললেই চলে।


২. আইন প্রণয়নে তাড়াহুড়া ও আলোচনার অভাব ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সাইবার নিরাপত্তা আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন সংশোধনসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ আইন সংসদে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই পাস হয়েছে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর সুপারিশ প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।


৩. সংসদের ওপর নির্বাহীর নিয়ন্ত্রণ একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা হওয়ায় সংসদ কার্যত প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছানির্ভর হয়ে পড়ে। দলীয় শৃঙ্খলার কারণে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশ সীমিত।

ফলে আইন বিভাগ তার সাংবিধানিক শক্তি হারিয়ে নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।


বাংলাদেশের ক্ষমতাকাঠামোর সবচেয়ে শক্তিশালী অঙ্গ হলো নির্বাহী বিভাগ। প্রশাসন, পুলিশ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, উন্নয়ন প্রকল্প, অর্থ বরাদ্দ—সবকিছুই এর নিয়ন্ত্রণে। প্রশাসনের রাজনৈতিককরণ


নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিতে রাজনৈতিক আনুগত্য বড় ভূমিকা রাখে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এতে প্রশাসনের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক মামলার অভিযোগ বহু আন্তর্জাতিক ও দেশীয় প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন এসব সংস্থার কর্মকাণ্ডে বিচার বিভাগের তদারকি সীমিত। জবাবদিহির ঘাটতি নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের জন্য কার্যকর জবাবদিহি ব্যবস্থা দুর্বল। সংসদ, স্বাধীন কমিশন বা নাগরিক সমাজ—কোনোটিই যথাযথভাবে নির্বাহীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ফলে নির্বাহী বিভাগ হয়ে উঠেছে ক্ষমতার প্রধান কেন্দ্র, যা ভারসাম্যনীতির পরিপন্থী।


সংবিধানের ৯৪ অনুচ্ছেদ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিলেও বাস্তবে বিচার বিভাগ নানা কাঠামোগত ও প্রশাসনিক নির্ভরতার মধ্যে আবদ্ধ। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নির্বাহীর প্রভাব
বিচারপতি নিয়োগে স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অভাব রয়েছে। এতে বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী প্রভাবের অভিযোগ বারবার উঠেছে। নিম্ন আদালতের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ
২০০৭ সালে পৃথকীকরণ হলেও বাস্তবে ম্যাজিস্ট্রেসি ও নিম্ন আদালতের অনেক প্রশাসনিক বিষয় এখনও নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত নয়। সংবেদনশীল মামলায় নীরবতা
নির্বাচন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক নিপীড়নের মতো ইস্যুতে বিচার বিভাগের সক্রিয়তা অনেক সময় প্রশ্নের মুখে পড়ে। ফলে বিচার বিভাগ তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ স্বাধীন অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। 


বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত হলেও বাস্তবে এই স্বাধীনতা নানা কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। বিচারপতি নিয়োগে স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতির অভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। এতে বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী প্রভাবের আশঙ্কা তৈরি হয়। নিম্ন আদালতের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি নির্বাহী প্রভাবমুক্ত হয়নি—এমন অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সাংবেদনশীল মামলায় বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে জনপরিসরে প্রশ্ন উঠছে। এই পরিস্থিতিতে বিচার বিভাগ তার সাংবিধানিক ভূমিকা পুরোপুরি কার্যকরভাবে পালন করতে পারছে কি না, সে প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে আসে।


ভারসাম্যহীনতার ফলাফল এই অসাম্য ক্ষমতাবণ্টনের ফলে রাষ্ট্র ও নাগরিক উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হারাচ্ছে
আইনের শাসন দুর্বল হচ্ছে
নাগরিক অধিকার সংকুচিত হচ্ছে
নির্বাচন ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা কমছে
ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকলে উন্নয়ন টেকসই হয় না—এটি শুধু রাজনৈতিক তত্ত্ব নয়, বৈশ্বিক বাস্তবতা।করণীয়: ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার পথ


১. সংসদের কার্যকারিতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে শক্তিশালী বিরোধী দল, সংসদীয় বিতর্ক ও কমিটির ক্ষমতা বাড়াতে হবে।

২. নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর স্বাধীন তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।


৩. বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনে নির্বাহী প্রভাব কমাতে সাংবিধানিক সংস্কার জরুরি।


৪. স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশনের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।


বাংলাদেশের সংবিধান আমাদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন আজ সংকুচিত। ক্ষমতার ভারসাম্যনীতি ভেঙে পড়লে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় না রাষ্ট্র হয়ে ওঠে এককেন্দ্রিক ও ভঙ্গুর। আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে প্রকৃত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা শুধু রাজনৈতিক সংস্কার নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও নাগরিক মর্যাদার পূর্বশর্ত। এখনই সময় সংবিধানের অক্ষর নয়, তার আত্মাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনার। বাংলাদেশের সংবিধান একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামো দিয়েছে। কিন্তু সেই কাঠামো কার্যকর রাখতে হলে সংবিধানের অক্ষরের পাশাপাশি তার চেতনার প্রতিফলন প্রয়োজন। ক্ষমতার ভারসাম্য ছাড়া গণতন্ত্র কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামোতে সীমাবদ্ধ থাকে। আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে প্রকৃত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাই পারে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী ও নাগরিককে নিরাপদ করতে। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করাই এখন সময়ের দাবি।

 

  • বি. এম. হাসান মাহমুদ, লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

সম্পর্কিত

মতামতক্ষমতাআইন

জনপ্রিয়


মতামত থেকে আরও পড়ুন

‘ইনকিলাব’ নিয়ে বিতর্ক: কলম-ওকিল-ইশারাও কি তবে বাংলা নয়?

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে দেওয়া এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ‘ইনকিলাব’ শব্দ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান বাংলা ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বাংলা ভাষাকে মায়ের ভাষা হিসেবে সম্মান করতে হলে এ ধরনের স্লোগান গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”

কেন অনলাইনে বিপুল ভোটে জয়ী হয় জামায়াতে ইসলাম? শুধুই কি ‘বট আইডি’, নাকি ভিন্ন কিছু?

‘বট’ আইডির বিষয়টি এখন বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেক নেটিজেনরাই জানেন, এবং ‘বট’ বলে ট্যাগ করেন, কিন্তু এর বাইরের কারণগুলো নিয়েই আলোচনা বেশি জরুরি এখন। আসলে এখানে জড়িত আরও বেশ কিছু গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা।

জেন-জির অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পালাবদল, নির্বাচনে ফিরছে কি পুরোনো রাজনীতি

জেন-জির নেতৃত্বে রাস্তায় নেমে এসেছিল একটি প্রজন্ম। তাদের কণ্ঠে ছিল পরিবর্তনের দাবি, চোখে ছিল নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। সেই জেন–জির নেতৃত্বেই সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে দীর্ঘদিনের শাসক শেখ হাসিনার। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি প্রজন্ম আশা করেছিল রাজনীতিতে মৌলি

ভোটের আগে ডিজিটাল বিভ্রান্তি: বট, ফেক আইডি ও ভুয়া জরিপ

সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে জামায়াত-শিবিরপন্থী অ্যাকাউন্ট, পেজ ও গ্রুপগুলোর অস্বাভাবিক সক্রিয়তা। পোস্টের পর পোস্ট, মন্তব্যের ঢল, লাইক ও শেয়ার দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে তারা কি ভোটের রাজনীতিতেও এগিয়ে? বাস্তবতা ভিন্ন। সোশ্যাল মি