মতামত
কেন অনলাইনে বিপুল ভোটে জয়ী হয় জামায়াতে ইসলাম? শুধুই কি ‘বট আইডি’, নাকি ভিন্ন কিছু?
.jpg)
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বহুল প্রতিক্ষীত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিশ্লেষক মহলে নানা সম্ভাবনা, পূর্বাভাস ও জল্পনা-কল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছিল। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া জরিপ এই আলোচনাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের নানা প্রান্তে অনলাইন জরিপ যেন রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার এক বিকল্প সূচক হয়ে ওঠে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, ফেসবুক-ভিত্তিক কমেন্ট ভোটের আয়োজন করে কয়েক হাজার পেজ যার মধ্যে মূলধারার গণমাধ্যমের পেজও ছিল। আবার অনেক ইউটিউব চেনেলেও পুলিং ভোটের আয়োজন দেখা গেছে যেখানে প্রচুর সংখ্যক ভোটও পড়েছে। এসব জরিপের প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে থাকতে দেখা যায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-কে, আর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। অথচ ঐতিহাসিক ও বর্তমান বাস্তবতায় এটি অবিশ্বাস্য হিসেবেই বিবেচনা করা যায়, কিন্তু প্রশ্ন হলো এমনটা কেন হয়? এর পেছনে আসলে মূল ব্যাপারগুলো কী কী?
‘বট’ আইডির বিষয়টি এখন বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেক নেটিজেনরাই জানেন, এবং ‘বট’ বলে ট্যাগ করেন, কিন্তু এর বাইরের কারণগুলো নিয়েই আলোচনা বেশি জরুরি এখন। আসলে এখানে জড়িত আরও বেশ কিছু গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা। তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে দায়িত্বশীলতার ঘাটতি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। ফ্যাক্ট-চেক ছাড়া খবর শেয়ার করা, ভুয়া বা এআই-নির্মিত কনটেন্টে আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া দেওয়া, কিংবা ধর্মীয় বার্তা ছড়িয়ে পুণ্য অর্জনের মানসিকতা এই বিষয়গুলোই সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন প্রায় নিত্যদিনের চিত্র হয়ে উঠেছে,।
গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে তৈরি কনটেন্ট খুব দ্রুত বিপুল সাড়া পায়, যেমন “ইসলামকে ভালোবাসলে লাইক দিন” শুধু এই একটা টেক্সটেও মিলিয়ন রিচ হতে দেখা গেছে, বস্তুত যেখানে ধর্মের দর্শন সম্পর্কে কোনো আলোচনা নেই। সে সূত্র ধরেই জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য ইসলামী দলের সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন যখন ওই সমস্ত নেটিজেনদের টাইমলাইনে যায়, তখন সেখানে ধর্মীয় আবেগ থেকেও অনেক বড় একটা পজিটিভ ফিডব্যাক যুক্ত হয় দলগুলোর নামের কারণেই। এ ঘটনা শুধু বাংলাদেশে নয়; বরং সনাতন সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ভারতের শিব সেনার ক্ষেত্রেও অনুরূপ প্রবণতা দেখা গেছে। মূলত এ কারণেই সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইনে ধর্মীয় দলগুলো অন্যান্য যে কোনো রাজনৈতিক দলের চেয়ে ভালো ভোট পেয়ে থাকে।
তবে এখান থেকেই ভিন্নতার শুরু, সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ব্যক্তিরা ধর্মীয় জায়গা থেকে দলগুলোকে সমর্থন জানিয়ে লাইক-কমেন্ট করেছে, তাদের মধ্যে অনেকের প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা গেছে, এই ব্যক্তিরা বেশিরভাগই সামাজিকভাবে নানা দর্শনের বিভক্ত। ফলে এখানে এসেই ভোট আর সোশ্যাল মিডিয়া সমর্থনের পার্থক্য ভাগ হয়ে যায়। তাই মোবাইলে ইসলামিক দলকে ভোট দিলেও সামাজিক দর্শন ভিন্ন হওয়ায় তারা ব্যালটে ভোট দেওয়ার আগে নিজেদের পারিপার্শ্বিক অবস্থার হিসাব মিলায়, ভোটের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ ভোটার লক্ষ্য রাখেন- কোন প্রার্থী পাশ করলে তার ব্যক্তি জীবনের সমস্যাগুলো সমাধান হবে, কোন প্রার্থীর সাথে তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক সুসম্পর্ক বিদ্যমান, এবং আরো অন্যান্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তাই হয়ে ওঠে তার কাছে ভোট প্রদানের যৌক্তিকতা। ফলে, যেহেতু বিএনপি এদেশের সমাজ ব্যবস্থায় বৃহত্তর রাজনৈতিক দল এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিতে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব বেশি, তাই স্বাভাবিকভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক ব্যবধানে পরাজিত হওয়া এই দলটি বাস্তবে বড় ধরনের বিজয় অর্জনে সক্ষম হয়েছে।
এই বিষয়গুলোকে আমরা যদি আরেকটু গবেষণার জায়গায় নিয়ে যাই তাহলে এখানে আলোচনা করতে হবে মনোবিজ্ঞানী অ্যালেন লুই এডওয়ার্ডসের ‘social desirability bias’ থিওরি। বাংলাদেশ খুব ভিন্নধর্মী আর্থসামাজিক বাস্তবতার দেশ। এখানে দলের নির্দিষ্ট কর্মীরা বাদে সাধারণ ভোটাররা কখনোই নিজেদের প্রকাশ্যে আনতে চান না, এবং প্রকাশ করতে চান না যে তারা আসলে কোন দলের ভোটার! প্রার্থীরা যখন ভোট চাইতে যান, এই ভোটাররা তখন আন্তরিকভাবে প্রায় সকল প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে থাকেন। সে ধারাবাহিকতায় সোশ্যাল মিডিয়াতেও অনেক ভোটার ইচ্ছে করে তার পছন্দের প্রার্থীকে অনলাইনে ভোট দেন না, যেন অন্যরা বুঝতে না পারে তিনি আসলে কোন দলের ভোটার। অ্যালেন লুই এডওয়ার্ডস এই থিওরীতে এই ধরণের ব্যাপারগুলোই আলোচনা করেছেন, এবং কিভাবে একটি বিষয় বাস্তবতার বাইরে গিয়ে ভুল ভাবে অন্যান্য মাধ্যমে ছড়াতে পারে সেটি বিশ্লেষন করেছিলেন, যা আমার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আরো একবার প্রত্যক্ষ করলাম।”
- শফি-উল মাওলা, কলামিস্ট ও রাইটার
সম্পর্কিত
জনপ্রিয়
মতামত থেকে আরও পড়ুন
‘ইনকিলাব’ নিয়ে বিতর্ক: কলম-ওকিল-ইশারাও কি তবে বাংলা নয়?
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে দেওয়া এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ‘ইনকিলাব’ শব্দ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান বাংলা ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বাংলা ভাষাকে মায়ের ভাষা হিসেবে সম্মান করতে হলে এ ধরনের স্লোগান গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”

জেন-জির অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পালাবদল, নির্বাচনে ফিরছে কি পুরোনো রাজনীতি
জেন-জির নেতৃত্বে রাস্তায় নেমে এসেছিল একটি প্রজন্ম। তাদের কণ্ঠে ছিল পরিবর্তনের দাবি, চোখে ছিল নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। সেই জেন–জির নেতৃত্বেই সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে দীর্ঘদিনের শাসক শেখ হাসিনার। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি প্রজন্ম আশা করেছিল রাজনীতিতে মৌলি
.jpg)
ক্ষমতার ভারসাম্যনীতিঃ বাংলাদেশে আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের অসাম্য অবস্থান
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মৌলিক স্তম্ভ হলো ক্ষমতার ভারসাম্যনীতি। মন্টেস্কিয়ুর তত্ত্ব অনুযায়ী রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান অঙ্গ আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে, কিন্তু একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যে রাখবে। এই নীতির উদ্দেশ্য
.jpg)
ভোটের আগে ডিজিটাল বিভ্রান্তি: বট, ফেক আইডি ও ভুয়া জরিপ
সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে জামায়াত-শিবিরপন্থী অ্যাকাউন্ট, পেজ ও গ্রুপগুলোর অস্বাভাবিক সক্রিয়তা। পোস্টের পর পোস্ট, মন্তব্যের ঢল, লাইক ও শেয়ার দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে তারা কি ভোটের রাজনীতিতেও এগিয়ে? বাস্তবতা ভিন্ন। সোশ্যাল মি


.jpg)


.webp)

.jpg)

.jpg)