এক্সক্লুসিভ
ঢাকায় বেড়েছে টার্গেট ছিনতাই
রাত ১১টা। রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় আসাদগেট দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান চৌধুরী। ফুটওভার ব্রিজের নিচে আসতেই হঠাৎ করে তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে পাঁচ-ছয়জন ছিনতাইকারী। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একজন তার পেটের কাছে একটি আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে ধরে। দুইজন পকেটে হাত দিয়ে নিয়ে নেয় দুইটি স্মার্টফোন ও নগদ সাত হাজার টাকা। তারপর মুহূর্তেই আবার অন্ধকারে মিলিয়ে যায় তারা।
রাজধানীর সুনসান রাস্তায় এভাবেই ওৎ পেতে থাকে ছিনতাইকারীরা। সুযোগ পেলে ছিনিয়ে নেয় পথচারীদের সবকিছু। অনেকটা টার্গেট করেই এ ধরনের ছিনতাই করে চক্রগুলো। যাত্রীবেশে বাসে উঠে চেতনানাশক দিয়ে অজ্ঞান করেও অনেক সময় কেড়ে নেয় সাধারণ মানুষের সর্বস্ব।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বলছে, পবিত্র রমজান ও আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানীতে বেড়েছে টার্গেট ছিনতাই। নগরীর ব্যস্ততম বাসস্ট্যান্ড, অন্ধকার গলিতে দলবদ্ধভাবে অবস্থান নিয়ে কেড়ে নিচ্ছে পথচারীদের মূল্যবান জিনিসপত্র। বাসে উঠে চেতনানাশক দিয়ে যাত্রীকে অজ্ঞান করে কেড়ে নিচ্ছে সবকিছু।
এ ধরণের কয়েকটি ঘটনার তদন্তে নেমে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ছিনতাই চক্রের ২৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। গত বুধবার (৬ এপ্রিল) ও শুক্রবার (৭ এপ্রিল) রাজধানীর হাজারীবাগ, লালবাগ, চকবাজার, কামরাঙ্গীরচর ও শাহবাগ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয়েছে ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহৃত লোহার রড, দা, ছোরা, চাকু, চেতনানাশক ট্যাবলেট ও মলম।
শনিবার (৯ এপ্রিল) সকালে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এ বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিবির যুগ্ম-পুলিশ কমিশনার (অ্যাডমিন অ্যান্ড ডিবি-দক্ষিণ) মো. মাহবুব আলম বলেন, সাধারণত রমজানের সময় ও যেকোন উৎসব তথা ঈদের আগে ডাকাতি, দস্যুতা, চুরি ও অজ্ঞান পার্টি ও ছিনতাইকারী চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাদেরকে প্রতিরোধে ডিএমপি কমিশনারের বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের দৌরাত্ম্য প্রতিরোধে বিশেষ অভিযানে নামে গোয়েন্দা বিভাগ। ডিবির রমনা ও লালবাগ বিভাগ বুধবার ও শুক্রবার লালবাগ, হাজারীবাগ ও নিউমার্কেট এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে এ চক্রের ২৭ জনকে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতাররা হলেন- আব্দুর রহমান শুভ (২২), মো. ইয়াছিন আরাফাত জয় (১৯), মো. বাবু মিয়া (২৮), মো. ফরহাদ (২১), হৃদয় সরকার (২৪), আকাশ (২০), মো. জনি খাঁন (২২), মো. রোকন (১৮), মো. মেহেদী হাসান ওরফে ইমরান (২৭), মো. মনির হোসেন (৪১), মো. জুয়েল (২২), মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে মাইকেল (৩৬), মো. আজিম ওরফে গালকাটা আজিম (৩৫), মো. শাকিল ওরফে লাদেন (২৪), ইমন (২২), মো. রাজিব (২৫), রাসেল (৩২), মিন্টু মিয়া ওরফে বিদ্যুৎ (৩৯), মো. মাসুদ (৩০), মো. তাজুল ইসলাম মামুন (৩০), মো. সবুজ (৩০), মো. জীবন (২৫), মো. রিয়াজুল ইসলাম (২৫), মো. মুন্না হাওলাদার (১৯), মো. শাকিল হাওলাদার (২০), মো. ফেরদৌস (২২) ও মো. আবুল কালাম আজাদ (৩৪)।
মাহবুব আলম বলেন, গ্রেফতারদের মধ্যে ২২ জনকে আজ আদালতে পাঠানো হয়েছে। গতকাল ৫ জনকে আদালতে পাঠানো হয়। এদের বিরুদ্ধে আগেও ৪৯টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই চুরি, দস্যুতা, ডাকাতির প্রস্তুতি ও মাদকের মামলা।
তিনি আরো বলেন, রোজার মাসকে ঘিরে ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম অনেকটা বেড়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এমন সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের অপরাধ আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। তারপরও আমরা বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছি। আশা করি অতি শীঘ্রই আমরা সস্তির জায়গায় এসে পৌঁছাবো।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, রাজধানীর ছিনতাইয়ের ঘটনার বেশিরভাগই ছিচকে চোররা করে থাকে। তারা রাস্তায় চলাচলকারী পথচারীদের মোবাইল ফোন অথবা স্বর্ণের চেইন টান দিয়ে নিয়ে যায়। এসব ছিনতাইকারীদের বেশিরভাগই মাদকসেবী।
এছাড়া ছিনতাই হওয়া এসব মোবাইল আইএমইআই পরিবর্তন করে পুনরায় ব্যবহার হয় জানিয়ে মাহবুব আলম বলেন, এই কাজটি করার জন্য আরেকটি চক্র সক্রিয় আছে। বিশেষ করে হাতিরপুলের ইস্টার্ন প্লাজা, মোতালেব প্লাজা, গুলিস্তানের মার্কেটে গেলেই যেকোনো সেটের আইএমইআই পরিবর্তন করা যায়। এদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
এই ধরনের চোরাই ফোন না কেনার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান ডিবির এই কর্মকর্তা।
মোবাইল ফোন ছিনতাই হওয়ার পর থানায় অভিযোগ করতে গেলে বেশিরভাগ সময়ই মামলা না নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এই বিষয়ে জানতে চাইলে মাহবুব আলম বলেন, পকেট থেকে যখন মোবইল চুরি হয় তখন ভুক্তভোগি নিজেও জানে না তার ফোনটি কি চুরি হয়েছে, নাকি হারিয়ে গেছে। কারণ ঘটনাটি ঘটে তার অজান্তে। ফলে পুলিশের কাছে যখন যায় তখন বিষয়টি সঠিক ভাবে উপস্থাপন করতে পারে না ভুক্তভোগি। এসব ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময়ই ভুক্তভোগি সাধারণ ডায়রি (জিডি) করে। পরে যদি পাওয়া যায় ফোনটি ছিনতাই হয়েছে, তখন সেই জিডি মামলার রূপান্তর করা হয়।
তবে কোনো থানা যদি মামলা না নেয় বা মামলা নিতে গড়িমসি করে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান যুগ্ম-কমিশনার মাহবুব আলম।
ছিনতাইকারীরা যে শুধু পথচারী বা যাত্রীদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েই শান্ত থাকে তাই নয়। বরং ছিনতাইয়ের কাজে বাধা পেলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে করছে ভুক্তভোগিকে গুরুতর জখমও করে। এতে অনেককে আহত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণও হারান। এমনকি ছিনতাইকারীদের দেওয়া চেতনানাশকেও ভুক্তভোগির প্রাণ হারানোর নজির রয়েছে।
তেমনই একটি ঘটনা গরীবের ডাক্তার খ্যাত আহমেদ মাহী বুলবুল হত্যা। গত ২৭ মার্চ ভোরে শেওড়াপাড়ায় মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে ছিনতাইকারীর হাতে পড়েন তিনি। চাহিদা মতো সবকিছু না দেওয়ায় তার উরুতে ছুরিকাঘাত করে সেই ছিনতাই চক্র। পরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। যদিও এই ঘটনায় চার ছিনতাইকারীকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তারা প্রত্যেকেই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।
.jpg)
.jpg)


.webp)
.jpg)
.jpg)
.jpg)
