আন্তর্জাতিক
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যেভাবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হয়ে উঠলেন
বিশ্বের বহু দেশের তুলনায় ইরানের শাসনব্যবস্থা ব্যতিক্রমধর্মী। দেশটিতে প্রেসিডেন্ট ও সংসদ সদস্যরা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলেও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকে একজন ধর্মীয় নেতার হাতে ‘সুপ্রিম লিডার’ বা সর্বোচ্চ নেতার কাছে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই পদে রয়েছেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
ইসলামি বিপ্লব থেকে উত্থান
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইরানে রেজা শাহ পাহলভীর রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র। বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। বিপ্লব-পরবর্তী ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদ সৃষ্টি হয়।
১৯৩৯ সালে মাশহাদে জন্ম নেওয়া আলী খামেনি তরুণ বয়সেই খোমেনির অনুসারী হন। শাহবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে একাধিকবার গ্রেপ্তার হন। ১৯৮১ সালে বোমা হামলায় গুরুতর আহত হয়ে তাঁর ডান হাত আংশিকভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়।
বিপ্লবের পর তিনি বিপ্লবী পরিষদে দায়িত্ব পালন করেন, পরে উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সংগঠনে ভূমিকা রাখেন। একই বছর ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে টানা আট বছর দায়িত্ব পালন করেন।
কীভাবে হলেন সর্বোচ্চ নেতা
১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর ৮৮ সদস্যের ধর্মীয় পরিষদ Assembly of Experts খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। যদিও সে সময় তিনি সংবিধানে নির্ধারিত ‘গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ’ মর্যাদায় ছিলেন না।
পরবর্তীতে সংবিধানে সংশোধন এনে শর্ত শিথিল করা হয় এবং তাঁকে আয়াতুল্লাহ পদে উন্নীত করা হয়। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা পুনর্বিন্যাস করা হয়, তবে সামরিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব সর্বোচ্চ নেতার হাতেই থাকে।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ। বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম, সামরিক নেতৃত্ব এবং গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তে তাঁর অনুমোদন অপরিহার্য। পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে বৈদেশিক নীতি সবক্ষেত্রেই তাঁর চূড়ান্ত মতামত কার্যকর হয়।
তাঁর শাসনামলে মোহাম্মদ খাতামি, মাহমুদ আহমাদিনেজাদ, হাসান রুহানি, এব্রাহিম রাইসি এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ একাধিক প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালন করেছেন। অনেকেই নীতিগত ভিন্নমত পোষণ করলেও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাঠামো অক্ষুণ্ণ থেকেছে।
২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচন, ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসা, ২০২০ সালে জেনারেল কাসেম সোলেইমানি হত্যাকাণ্ড এবং একই বছরে ইউক্রেনীয় যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিতের ঘটনা এসব বড় সংকটে খামেনির নেতৃত্ব ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
ইসরায়েলবিরোধী কড়া অবস্থান এবং পশ্চিমা বিশ্ববিরোধী বক্তব্যের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস। সদস্যদের প্রার্থীতা যাচাই করে Guardian Council, যার ওপরও সর্বোচ্চ নেতার প্রভাব থাকে। নির্বাচিত হলে সর্বোচ্চ নেতা আজীবন দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
৮৬ বছর বয়সী খামেনির স্বাস্থ্যগত অবস্থা নিয়ে জল্পনা চলমান। তিনি মারা গেলে বা পদত্যাগ করলে উত্তরসূরি কে হবেন, তা নির্ধারণ করবে অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস এমনই সাংবিধানিক বিধান রয়েছে।
ইসলামি বিপ্লব-পরবর্তী ইরানে আলী খামেনিই দ্বিতীয় ব্যক্তি, যিনি সর্বোচ্চ নেতার পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁর উত্থান, ক্ষমতার বিস্তার এবং দীর্ঘ শাসনকাল ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
জনপ্রিয়
আন্তর্জাতিক থেকে আরও পড়ুন
খামেনির হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন: পুতিন
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হত্যাকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রোববার এক বিবৃতিতে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান–এর কাছে গভীর শোক ও সমবেদনা জানান।

‘অপারেশন রোরিং লায়ন’-এ এক মিনিটে খামেনিসহ ৪০ শীর্ষ কর্মকর্তার মৃত্যু
ইসরায়েলের দাবি, ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’-এর প্রথম দফার হামলায় এক মিনিটের মধ্যে ইরানের ৪০ জন শীর্ষ সামরিক কমান্ডার নিহত হয়েছেন। রোববার (১ মার্চ) দেওয়া এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এ তথ্য জানায়।

শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধাক্কা: যেসব প্রভাবশালী ব্যক্তিকে হারাল ইরান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত বিমান হামলায় ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা নেতৃত্বে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির দাবি করা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা থেকে শুরু করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।

আমিরাতে ১৩৭ ক্ষেপণাস্ত্র ও ২০৯ ড্রোন নিক্ষেপ ইরানের, বিমানবন্দরেও আঘাত
মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত–এ গত শনিবার থেকে এ পর্যন্ত মোট ১৩৭টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ২০৯টি বিস্ফোরকবাহী ড্রোন নিক্ষেপ করেছে ইরান। এ তথ্য জানিয়েছে আলজাজিরা।


.jpg)


.jpg)
