মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ সংসদে পাস না হওয়া এবং তা বাতিলের প্রেক্ষাপটে সংসদে উপস্থাপিত তথ্যের জবাব, সরকারের প্রকৃত আপত্তি চিহ্নিতকরণ এবং ভবিষ্যৎ আইনের মান নিশ্চিত করতে প্রস্তাবনা তুলে ধরে খোলা চিঠি দিয়েছেন সদ্য বিদায়ী পাঁচজন মানবাধিকার কমিশনার।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) এই খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, মো. নূর খান লিটন, ইলিরা দেওয়ান, অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম এবং ড. নাবিলা ইদ্রিস।
চিঠিতে তারা উল্লেখ করেন, মানবাধিকার সুরক্ষায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে ভুক্তভোগীদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তারা এ অবস্থান নিয়েছেন। এটি কোনো ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে নয়, বরং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তাদের অবস্থান।
চিঠিতে বলা হয়, অধ্যাদেশ বাতিলের পক্ষে সংসদে যেসব যুক্তি দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে একাধিক তথ্য সঠিক নয়। তারা উল্লেখ করেন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে।
এছাড়া তদন্তের নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং জরিমানা আদায়ের পদ্ধতিও অধ্যাদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে বলে দাবি করা হয়। অথচ সংসদে এসব বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
কমিশনাররা বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আইন কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে পারে, বিচ্ছিন্ন গুমের মতো অপরাধ নয়। ফলে গুম অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় নতুন করে সংঘটিত গুমের ঘটনায় আইনি শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
চিঠিতে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট ঘটনায় কে সুরক্ষিত থাকবে এবং কোনটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে, তা নির্ধারণে মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু ২০০৯ সালের আইনে সেই ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় নিরপেক্ষ তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে চিঠিতে বলা হয়, সরকারের মূল আপত্তি ছিল মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা সীমিত করা। এর মধ্যে রয়েছে—
- কমিশনকে মন্ত্রণালয়ের অধীন রাখার প্রস্তাব
- নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতির প্রয়োজনীয়তা
- গুমের সংজ্ঞা সীমিত করার উদ্যোগ
- কমিশনার নিয়োগে নির্বাহী প্রভাব বাড়ানোর প্রচেষ্টা
চিঠিতে বলা হয়, ভবিষ্যতে নতুন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকার যদি উল্লিখিত আপত্তিগুলো বজায় রাখে, তবে তা কার্যকর ও শক্তিশালী আইন হবে না। বরং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে আরও স্বাধীন ও কার্যকর আইন প্রণয়ন জরুরি।
তারা আরও উল্লেখ করেন, গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা রয়েছে এ ধরনের অপরাধকে ফৌজদারি আইনে সংজ্ঞায়িত করার।
খোলা চিঠিতে কমিশনাররা বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের প্রশ্ন—“এখন আমাদের কী হবে?”—এর জবাব কথায় নয়, কার্যকর ও শক্তিশালী আইন প্রণয়নের মাধ্যমেই দিতে হবে।