জাতীয়


সুপারিশ বাস্তবায়নের অভাবে বেড়েই চলেছে নৌ-দুর্ঘটনা


হেড অফ ডিজিটাল মিডিয়া

শামসুল আলম

প্রকাশিত:২১ মার্চ ২০২২, ০৬:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার

সুপারিশ বাস্তবায়নের অভাবে বেড়েই চলেছে নৌ-দুর্ঘটনা

সুব্রত চন্দ: নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় টার্মিনাল ঘাট থেকে যাত্রী নিয়ে মুন্সীগঞ্জের দিকে যাচ্ছিল এমএল আশরাফ উদ্দিন নামের একটি লঞ্চ। পথে এমভি রূপসী ৯ নামের একটি কার্গো জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লেগে মুহূর্তেই শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবে যায় লঞ্চটি। এ সময় লঞ্চের ছাদে ও সামনে থাকা গুটিকয়েক যাত্রী সাঁতরে পাড়ে উঠতে পারলেও পানিতে তলিয়ে যান অনেকেই। পাশের আরেকটি লঞ্চ থেকে যাত্রীরা মোবাইলে ধারণ করেন এই মর্মান্তিক দৃশ্য। 


রোববার (২০ মার্চ) দুপুরে নারায়ণগঞ্জের চর সৈয়দপুর এলাকার আল আমিন নগর ব্রিজের কাছে ঘটা এই নৌ-দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজ শুরু করেছে ফায়ার সার্ভিস ও কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন সংস্থা। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ১৫ জনকে জীবিত ও এক শিশুসহ পাঁচজনকে মৃত উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। 


নদীমাতৃক বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান মাধ্যম নৌ-পথ। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ এই পথে যাতায়াত করে। পাশাপাশি পরিবহণ করা হয় পণ্যও। কিন্তু নিরাপদ নৌ-পথের অভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায়ই খবর আসে নৌ-দুর্ঘটনার। এসব দুর্ঘটনার বেশিরভাগই ছোট-খাটো হলেও, মাঝে মাঝে করুণ ট্র্যাজেডির সৃষ্টি হয়। প্রাণহানি হয় অসংখ্য মানুষের।


প্রতিবারই বড় ধরনের কোনো নৌ-দুর্ঘটনা ঘটার পর সরকারের পক্ষ থেকে একাধিক তদন্ত কমিটি করা হয়। সেসব কমিটি তদন্ত শেষে দুর্ঘটনার কারণ, অভিযুক্ত ও পরবর্তীতে দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশও করে। কিন্তু সেসব সুপারিশের যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় নৌ-দুর্ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।


গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর ভোর ৩টার দিকে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান নামের একটি যাত্রীবাহী লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। লঞ্চটি ঢাকা থেকে বরগুনা যাচ্ছিল। ওই দুর্ঘটনায় নিহত হন ৪৯ জন, দগ্ধ হন অন্তত ৮০ জন। দুর্ঘটনার পর সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আলাদা আলাদা তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। যারমধ্যে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে করা তদন্ত কমিটি এই দুর্ঘটনার জন্য লঞ্চের মালিক, মাস্টার ও ইঞ্জিন চালকসহ মোট ১১ জনকে দায়ী করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। পাশাপাশি দুর্ঘটনা এড়াতে ২৫টি সুপারিশও করে। অথচ এই দুর্ঘটনার প্রায় তিন মাসের মাথায় শীতলক্ষ্যায় লঞ্চডুবির এই ঘটনা ঘটলো।


ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, গত সাত বছরে (২০১৫-২০২১) সারাদেশে ছোট-বড় নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছে মোট ৪ হাজার ৭৯১টি। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪ হাজার ২৩৮ জন। এর মধ্যে ২০১৫ সালে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪১৮টি, মারা গেছেন ৪৭৯ জন। ২০১৬ সালে ঘটেছে ৪২৫টি, মারা গেছেন ৪১০ জন। ২০১৭ সালে ঘটেছে ৫৩০টি, মারা গেছেন ৬৪৩ জন। ২০১৮ ঘটেছে ৫০৮টি, মারা গেছেন ৪২৬ জন। ২০১৯ সালে ঘটেছে ৮২০টি, মারা গেছেন ৬৮৫ জন। ২০২০ সালে ঘটেছে ১ হাজার ২০৩টি, মারা গেছেন ৯৫৩ জন এবং ২০২১ সালে ঘটেছে ৮৮৭টি, মারা গেছেন ৬৪২ জন।


প্রতিবার বড় ধরনের নৌ-দুর্ঘটনা ঘটার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, করা হয় দুর্ঘটনা রোধের নানা সুপারিশ। কিন্তু তারপরও ইতি টানা যাচ্ছে না এসব দুর্ঘটনার। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মীর তারেক আলী বলেন, ‘গত ৩০ বছরে সংঘটিত নৌ-দুর্ঘটনায় ৪০০ থেকে ৫০০টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের অনেকে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন, অনেকেই দেননি। তবে জমা দেওয়া প্রতিটি তদন্ত প্রতিবেদনে নৌ-দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নানা সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। কিন্তু সেগুলো ঠিকমতো বাস্তবায়ন না হওয়ায় দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা যাচ্ছে না।’


বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত নৌ-দুর্ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোর প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার জন্য অভিযুক্ত কর্মকর্তারা জবাবদিহিতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। নৌ-দুর্ঘটনা সংক্রান্ত মামলায় বেশিরভাগ সময় নৌ-যান মালিককে অভিযুক্ত করা হলেও তাদের আধিপত্যের কারণে সাজা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এছাড়া দিনের পর দিন আসামিরা আদালতে উপস্থিত হয় না এবং তাদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে।


এদিকে বিভিন্ন নৌ দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ করে যাত্রীবাহী লঞ্চ দুর্ঘটনার জন্য পাঁচটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে নৌ-পরিবহণ অধিদপ্তর। সেগুলো হলো- দেশে লঞ্চ দুর্ঘটনার ৪৩ শতাংশই ঘটে অন্য নৌ-যানের সঙ্গে ধাক্কা লেগে। ২৫ শতাংশ ঘটে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের কারণে। ২৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে বৈরী আবহাওয়ার কারণে। ৬ শতাংশ ঘটে আগুন ও বিস্ফোরণে এবং বাকি ৩ শতাংশ ঘটে লঞ্চের তলা ফেটে। এসব কারণের বাইরে মানবসৃষ্ট ভুল, নৌ-রুট ও বন্দরের দুর্বল ব্যবস্থাপনা, যাত্রীদের মধ্যে প্রয়োজনীয় সচেতনতার অভাবেও অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে।


বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘নৌ-দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে কখনোই কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। যখনই কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটে, তখনই কোনোমতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দায় সারা হয়। এসব তদন্ত কমিটি যেমন আলোর মুখ দেখে না, তেমনি তদন্ত প্রতিবেদনে দেওয়া সুপারিশ নিয়েও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না।’


তিনি আরো বলেন, ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে অবৈধ নৌযান চলাচল বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে মানুষের জীবন বাজি রেখেই চলছে অনিবন্ধিত ও অবৈধ এবং লাইসেন্স ও ফিটনেসবিহীন নৌ-যান। আর প্রতি বছরই বাড়ছে নৌ দুর্ঘটনার পরিমাণ।’


জনপ্রিয়


জাতীয় থেকে আরও পড়ুন

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌদি রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ড. আব্দুল্লাহ জাফর এইচ বিন আবিয়া। রোববার বেলা ১১টার দিকে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

শপথের প্রয়োজন নেই, ‘হ্যাঁ’ অটোমেটিক কার্যকর হবে: পানিসম্পদ মন্ত্রী এ্যানি

পানি সম্পদ মন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)র যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, সংসদ নির্বাচন ও শপথ সম্পন্ন হয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় এ বিষয়ে আলাদা কোনো শপথের প্রয়োজন নেই; এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে।

মহান শহীদ দিবসে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে জনস্রোত

ভোরের আলো ফুটতেই রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের ঢল নামে সেখানে।

তেজগাঁও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রথম কর্মদিবস তারেক রহমানের

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অফিস করেছেন। শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টা ১০ মিনিটে তিনি কার্যালয়ে পৌঁছালে মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার ও অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন তাকে স্বাগত জানান।