
উত্তাল সমুদ্রে ভারতের প্রথম রেলসেতু ‘পামবান’! শ্রীলঙ্কার সাথে আন্তঃদেশীয় যোগাযোগের স্বার্থেই এই অত্যাধুনিক সেতু নির্মাণ করলো ভারত! এর মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে দেশটি জানান দিলো, ইঞ্জিনিয়ারিং এ কোনো অংশেই চীন, জাপান কিংবা জার্মানির চেয়ে পিছিয়ে নেই ভারত! ভারতের তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমের পামবান দ্বীপের সঙ্গে দেশটির মূল ভুখণ্ডের যোগাযোগ আরো শক্তিশালী করতে এর পাশেই নির্মিত হলো পামবান রেলসেতু। কিন্তু এর জন্যে প্রকৌশলীদের প্রস্তুত করতে হয়েছে ভিন্ন এক নশকা। আশ্চর্য হলেও সত্যি, জাহাজ পারাপারের জন্য সেতুর মাঝ বরাবর প্রয়োজন অনুযায়ী বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। জাহাজ পারাপারের কাজ সম্পন্ন হলেই সেতু জুড়ে গিয়ে পুনরায় রেল চলাচলের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। ১০৪ বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল এই মেগা স্থাপনা। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১২ দশমিক ৫ মিটার উপরে অবস্থিত সাত হাজার ফুট দৈর্ঘ্যের এই রেলসেতুটি ১৪৫টি কংক্রিটের স্তম্ভের উপর নির্মাণ করা হয়েছে। এটি সমুদ্রের উপরে হওয়ার কারণে ঝড়ের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। বলা হয়, ফ্লোরিডার পরে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ানক পরিবেশে এই রেল সেতু যাত্রী পারাপার করে। তবে এই সেতু দিয়ে রেলে যাতায়াতকারীদের এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি তৈরি হয়! ম্যাজিক্যাল এই সেতুটির প্রথম নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিলো ১৯১১ সালে। আর উদ্বোধন করা হয় ১৯১৪ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি। এরপর ১৯১৫ সালে সেতুর উপর দিয়ে রেল চলাচল শুরু হয়। অর্থাৎ বৃটিশ আমলে গড়ে ওঠে এই প্রকল্প। ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তামিলনাড়ুর মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে রামেশ্বরমকে সংযুক্ত রাখার একমাত্র পথ ছিল এটি। ২০১০ সালে মুম্বাইয়ে বান্দ্রা-ওরলি সেতু গড়ে ওঠার পর ভারতের দীর্ঘতম সেতুর তকমা হারায় এই সমুদ্র সেতু। তাছাড়া দীর্ঘ দিন ধরে সেতুটি লন্ডভন্ড অবস্থায় ছিল। ১৯৬৪ সালের ঘূর্ণিঝড়ের সময় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এর। প্রাচীন এই সেতু ২০১৮ সালে পুনঃনির্মাণের জন্য রেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তিন মাস পর্যন্ত চলে মেরামতের কাজ। ২০১৯ সাল থেকে ফের তাতে রেল চলাচল শুরু হয়। এদিকে মণ্ডপম এবং রামেশ্বরমের মধ্যে সংযোগ গড়ে তোলার জন্য আবারও গড়ে ওঠে রেলসেতু। এর নামও ‘পামবান রেল সেতু’। এটি আসলে পুরনো সেতুর পাশে গড়ে ওঠা নতুন একটি রেল সেতু। দুই কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু দিয়ে চলতি বছরই রেল চলাচল শুরু হয়েছে। পুরনো সেতুর তুলনায় নতুন এই সেতু আরো তিন মিটার উঁচু এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২২ মিটার উঁচুতে অবস্থিত।আগের চেয়ে আরও বেশি ভার নিতে সক্ষম নতুন এই পামবান রেল সেতু। এর ওপর দিয়ে আরও দ্রুতগতিতে সমুদ্র পারাপার করছে রেল। সেতুতে প্রতিনিয়তই যুক্ত হচ্ছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। সেতুর দুপাশের অত্যাধুনিক সেন্সর লাগানো রয়েছে। ট্রেন আসার আগেই তা আঁচ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেমে আসে সেতুর ওই ৬৩ মিটার দীর্ঘ অংশ। ডাবল লাইন নিয়ে তৈরি হচ্ছে এই স্থাপনা। যে কারণে বিপরীত দিক থেকে দুটি ট্রেন একই সঙ্গে যাতায়াত করতে পারবে। পুরনো পামবান সেতুটি অনুভূমিকভাবে খুলে যায়। সেটি স্বয়ংক্রিয় ছিল না। কিন্তু এই সেতুটি স্বয়ংক্রিয়। ইলেক্ট্রো-মেক্যানিকাল কন্ট্রোল সিস্টেম রয়েছে। পামবান রেলসেতু ভ্রমণ করতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই তামিলনাডু যেতে হবে, আর তাহলেই আপনি নিতে পারবেন সমুদ্রের ওপর দিয়ে ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতা!


