জাতীয়


বিদায় ‘দুই নেত্রী’র যুগ: ৩৬ বছর পর নতুন সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় বাংলাদেশ


দূরবিন ডেস্ক

দূরবিন ডেস্ক

প্রকাশিত:১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার

বিদায় ‘দুই নেত্রী’র যুগ: ৩৬ বছর পর নতুন সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় বাংলাদেশ

ছবি: সংগৃহীত


বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশ প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন। ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত মাঝখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর বাদ দিলে প্রায় সাড়ে তিন দশক রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ছিল দুই নেত্রীর হাতে।

 

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক মেরুকরণ সেই দীর্ঘ অধ্যায়ে ছেদ টেনেছে। এর ধারাবাহিকতায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘ ৩৬ বছর পর দেশ একজন নতুন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে যা বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।

 

দীর্ঘ ৩৬ বছরের রাজনৈতিক অধ্যায়

১৯৯১ সালে সামরিক শাসনের অবসান এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সূচিত হয় এক নতুন অধ্যায়। সেই সময় থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত মাঝে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কাল বাদ দিলে দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দুই নারী নেতা। প্রায় ৩৪ বছরের এই দীর্ঘ সময়ে দেশের রাজনীতি, নির্বাচন, ক্ষমতার পালাবদল ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি মূলত তাঁদের নেতৃত্বকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে।

 

এই দীর্ঘ সময়কালকে সাধারণভাবে ‘দুই নেত্রীর যুগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এ সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, দলীয় কাঠামো এবং এমনকি ভোটের রাজনীতিও মূলত দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে কেন্দ্র করেই বিকশিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।

 

২০২৪ : পরিবর্তনের সূচনা

২০২৪ সালের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সময় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বছরটির মাঝামাঝি শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় পর্যায়ের গণআন্দোলনে রূপ নেয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্র তৈরি করে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রজন্মগত পরিবর্তনের সূচনা করেছে। দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভাঙন ধরে নতুন এক বাস্তবতার উদ্ভব হয়েছে, যেখানে নতুন নেতৃত্বের উত্থানকে এখন সময়ের অনিবার্য দাবি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

 

নারী নেতৃত্বের শক্তিশালী অধ্যায়

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের উত্থান বিশ্ব রাজনীতিতেও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো একজন নারী প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে এ যুগের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে দুই নারী নেতা দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে দীর্ঘ সময় সরকার পরিচালনা করেন।

 

এই সময়কালে বাংলাদেশ অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে। একই সঙ্গে নির্বাচন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে নানা বিতর্ক ও সমালোচনাও তৈরি হয়েছে। তবুও তিন দশকের বেশি সময় ধরে নারী নেতৃত্ব দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।

 

নতুন নেতৃত্ব

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বে নারী উপস্থিতি না থাকায় বিশ্লেষকদের ধারণা, আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘ ৩৬ বছর পর দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে একজন পুরুষ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ প্রায় নিশ্চিত।

 

এটি শুধু ব্যক্তির পরিবর্তন নয়; বরং একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক যুগের অবসান ও নতুন অধ্যায়ের সূচনার প্রতীক। নতুন নেতৃত্বের প্রতি জনগণের প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধরে রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়াবে।

 

ইতিহাসের ধারাবাহিকতা

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামরিক শাসনের সময়কাল এবং গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন- দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস অত্যন্ত ঘটনাবহুল ও বহুমাত্রিক।

 

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা নতুন এক যুগের সূচনা করে। এরপর থেকে ধারাবাহিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে এবং দেশের রাজনৈতিক কাঠামো ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ও স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে।

 

নির্বাচন ঘিরে প্রত্যাশা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশজুড়ে আলোচনা ও প্রত্যাশা বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

 

নতুন প্রজন্মের ভোটারদের অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি এবং পরিবর্তনের প্রত্যাশা এবারের নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ভিন্নধর্মী পরিবেশ।

 

একটি যুগের সমাপ্তি, নতুন সূচনা

বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ তিন দশকের রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়ে দেশ প্রবেশ করতে যাচ্ছে নতুন এক পর্বে। যে রাজনৈতিক বাস্তবতা এতদিন রাষ্ট্র পরিচালনা ও ক্ষমতার বিন্যাসকে প্রভাবিত করেছে, তা বদলে এখন নতুন নেতৃত্বের হাতে দায়িত্ব অর্পণের প্রস্তুতি চলছে।

 

৩৬ বছর পর নতুন সরকারপ্রধানের শপথ কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক প্রতীকী ও তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দেশের রাজনীতি এখন অপেক্ষায় এক নতুন সূর্যোদয়ের।


সম্পর্কিত

সংসদ নির্বাচনশেখ হাসিনাখালেদা জিয়া

জনপ্রিয়


জাতীয় থেকে আরও পড়ুন

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ছে, ৪৩টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে বাস্তবায়ন করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকার শিক্ষাকে জাতির শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে এবং একটি গুণগত, জীবনমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। বুধবার (৮ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্য মো. সেলিম রেজার লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানিয়েছেন।

৫ বছর টিকাদান ক্যাম্পেইন না হওয়ায় হামের ঝুঁকি বেড়েছে: সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি ও টিকার সংকটের জন্য পূর্ববর্তী সরকারের নীতিগত ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানিয়েছেন, গত সাড়ে পাঁচ বছর হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন না হওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে, যার ফলেই বর্তমানে সংক্রমণ বেড়েছে।

হামের টিকা বিতর্কে ড. ইউনূসসহ ২৪ উপদেষ্টার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আইনি নোটিশ

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব এবং টিকাদান কর্মসূচি ঘিরে বিতর্কের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসসহ ২৪ জন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়ে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

দোকানপাট ও শপিং মল খোলা রাখার নতুন সময় জানালেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী

দেশের সব দোকানপাট ও শপিং মল খোলা রাখার সময় এক ঘণ্টা বাড়িয়েছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে সন্ধ্যা ৬টার পরিবর্তে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে। রোববার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।