প্রকাশ্যে নাচার দায়ে দশ বছরের কারাদন্ড! সম্প্রতি ইরানের এক যুগলকে এমন কঠিন সাজাই দিয়েছেন তেহরানের একটি নৈতিকতা আদালত!
দূর্নীতি, যৌনকর্মীদের উৎসাহ প্রদান, জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা সহ সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণার মতো গুরুতর সব অভিযোগ আনা হয়েছে অভিযুক্ত যুগলের বিরুদ্ধে! এমনটাই জানিয়েছে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো।
খবরে বলা হয়, রাজধানী তেহরানের আজাদি টাওয়ারের সামনে রোমান্টিক ভঙ্গিমায় নাচের একটি ভিডিও ধারণ করেন আমির মোহাম্মদ আহমাদি ও তাঁর বাগ্দত্তা আসতিয়াজ হাকিকি।
পরবর্তীতে সেটি প্রকাশ করেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইন্সটাগ্রামে। কয়েকদিনের মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো ভাইরাল হয় তাদের ওই ভিডিওটি।
এরপর নভেম্বর মাসের শুরুর দিকেই তাদেরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। দেড় মাসের মাথায় আমির-হাকিকি'কে দোষী সাব্যস্ত করে দশ বছর কারাভোগের কঠোর এ সাজা দেয়া হল। একই সাথে আদেশ দেয়া হয় যে, দুই বছর তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে পারবেন না। এমনকি দেশ ছেড়েও যেতে পারবেন না কোথাও।
তরুণ এই দম্পতির এই সাজার ঘোষণার উঠেছে নিন্দার ঝড়। ফের প্রশ্নবিদ্ধ দেশটির নারী স্বাধীনতার ইস্যু। ইরানের মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সম্প্রতি নারী স্বাধীনতার দাবিতে সৃষ্ট আন্দোলনের অংশ হিসেবেই তাদের ওই ভিডিওটিকে দেখছে প্রশাসন। একারণেই তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনে দেয়া হয়েছে কঠোর সাজা। তবে অভিযুক্তদের দাবি- আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত নন তারা। বরং ইন্সটাগ্রাম ব্লগার তারা। এছাড়া আসতিয়াজ হাকিকি নিজে একজন ফ্যাশন ডিজাইনার।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে মাথায় কাপড় না দেয়ার অভিযোগে কুর্দী তরুণী মাহশা আমিনিকে গ্রেফতার করে ইরানের নৈতিকতা পুলিশ। পরে পুলিশি হেফাজতে তার মৃত্যু হলে নারীদের পোশাকের স্বাধীনতার দাবি দেশজুড়ে ছড়ায় তীব্র আন্দোলন। সরকারও বিক্ষোভ দমাতে কঠোর অবস্থান নেয়। বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় অনেককেই কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন শতাধিক মানুষ। সম্প্রতি চার বিক্ষোভকারীর ফাঁসির দণ্ডও কার্যকর করা হয়েছে।
ইরানের শরিয়া আইন অনুযায়ী, নারীদের মাথা ও চুল ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক। তাঁদের এমন লম্বা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরতে হবে, যাতে শরীরের গঠন বোঝা না যায়। সরকারি কোনো অফিসে হিজাব ছাড়া নারীরা যেতে পারবেন না। নিয়ম অমান্য করলে রয়েছে চুয়াত্তরটি দোররা মারার বিধান। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের আগ অবধি ইরানে নারী পুরুষ একসাথে ক্লাস করারও নিয়ম নেই।
১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে দেশটিতে আসতে থাকে এসব কড়াকড়ি। এমনকি এসব বিষয় তদারকির জন্য আধা সামরিক বাহিনী নৈতিকতা পুলিশও গঠন করা হয়। বাহিনীটি ইরানের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সরাসরি সংযুক্ত। শীর্ষ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের ঠিক করা ইসলামি নীতি-নৈতিকতা মানুষ মানছে কি না, তা তারা নিশ্চিত করতো। অবশ্য গেল বছর চরম আন্দোলনের মুখে এই নৈতিকতা পুলিশ বাহিনীর বিলুপ্তি ঘোষণা করে সরকার।
‘নীতি পুলিশের’ প্রতিটি ইউনিটে একটি করে ভ্যান থাকতো। এই ভ্যানগাড়ি বাহিনীতে নিযুক্ত নারী ও পুরুষ উভয় সদস্যরাই থাকতো। তারা মূলত ব্যস্ত জনবহুল এলাকায় টহল দিতো। কেউ যথাযথ আচরণ না করলে বা যথাযথ পোশাক না পরলেই তাদেরকে আটক করা হতো। কিছু ক্ষেত্রে সতর্ক করে ছেড়ে দেয়া হতো। আবার কিছু ক্ষেত্রে নীতি লঙ্ঘনকারী ব্যক্তিকে আটক করে থানা বা সংশোধনাগারে নিয়ে যাওয়া হতো। সেখানে নিয়ে গিয়ে তাঁদের কীভাবে পোশাক পরতে হবে, কী নৈতিক আচরণ করতে হবে, সে বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হতো। পরে পুরুষ অভিভাবকদের ডেকে তাদের জিম্মায় ছাড়া হত আটকৃত ব্যক্তিকে। অনেক নিয়ম লঙ্ঘনকারী ব্যক্তিদের জরিমানাও করতো নিরাপত্তা বাহিনী।
এমনকি ইরানের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েও উপস্থিতি রয়েছে পুলিশ বাহিনীরa . বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পোশাক ও আচরণ নজরদারি করতো তারা। সবমিলিয়ে ইরানের এহেন পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার মতামত কী?