বিদ্যানন্দ- ভেজালের ভীড়ে এক টুকরো শুদ্ধতার নাম! হাজারো দুঃখী মানুষের এক টুকরো সুখের নাম এই বিদ্যানন্দ!
তবে আজকের বিদ্যানন্দ আমাদের যতটা আনন্দের গল্প শোনায়, এর প্রতিষ্ঠাতা কিশোর কুমার দাশের জীবনের গল্পটা ততটাই বিষাদময়! জীবনের প্রতিটি মুহুর্তের সাথে লড়াই করে বেড়ে উঠতে হয়েছে তাকে।
পড়াশোনা না পারায় শিক্ষকের হাতে মার খেয়েছেন টানা ৩ থেকে ৪ ঘন্টা। অর্থের অভাবে থমকে গিয়েছিল শিক্ষাজীবন। ৭ বছরের প্রেম শেষে বিয়ের পর, সংসার টিকেছিল মাত্র ৬ মাস।
জীবনের প্রতি চরম হতাশাগ্রস্থ হয়ে, আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন একাধিকবার। তবুও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, গড়ে তুলেছেন বিদ্যানন্দের মতো ব্যাতিক্রমী এক চ্যারিটি ফাউন্ডেশন।
কিশোর কুমারের পরিবারে ছিল ৫ ভাইবোন আর মা বাবা। সবার জন্য বরাদ্দ ছিল একটি মাত্র ঘর। ১০ ফুট বাই ৮ ফুটের সেই রুমটিতেই ,সবাই গাদাগাদি করে ঘুমাতেন।
জীবনে বিলাসিতা তো দূরের বিষয়, ঠিক মতো তিন বেলা খাবারও পেতেন না। ৭ সদস্যের পরিবারে একমাত্র বাবাই ছিল উপার্জনক্ষম ব্যাক্তি।
৩য় শ্রেনীর সরকারি কর্মচারী হিসেবে যে বেতন পেতেন, মাসের অর্ধেক গেলেই তা ফুরিয়ে যেত।
তাই একবেলা না খেয়েই কাটাতে হতো তাদের। বাকি দুইবেলাও পেট ভরে খেতে পারতেন না।
কারন নির্দিষ্ট পরিমান ভাত এবং তরকারি বরাদ্দ থাকতো সবার জন্য। একবার প্লেটের ভাত ও তরকারি শেষ হয়ে গেলে, দ্বিতীয়বার আর নেয়ার সুযোগ পেতেন না।
ছাত্র হিসেবে বাকি ৪ ভাই বোনের মতো মেধাবী না হলেও, দারিদ্র্যতার মাঝে পড়াশোনাটা চালিয়ে গিয়েছেন কোন রকম। কিন্তু এস.এস.সি পাশের পর সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।
অভাবের সংসারে দেখা দেয় নতুন বিপত্তি। বয়স শেষ হয়ে যাওয়ায় চাকরি থেকে অবসরে যান কিশোর কুমারের বাবা। এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা হয়ে যায় সবাই।
শেষ পর্যন্ত লেখাপড়া বিসর্জন দিয়ে, অন্নের সন্ধানে চাকরিতে যোগ দেন কিশোর কুমার দাশ। তবে নিজেকে সেখানেই থামিয়ে রাখেননি অদম্য এই যুবক।
চাকরির পাশাপাশি ৬ থেকে ৭ টি টিউশন করাতেন তখন। ২ বছর সবকিছু এভাবেই চলছিল। ততদিনে বেশ কিছু টাকা জমা হয় তার হাতে। তাই চাকরি ছেড়ে দিয়ে শুরু করেন দ্বিতীয় ধাপের পড়াশোনা।
তবে সবকিছু সামলে ঠিকমতো মনযোগী হতে পারছিলেন না। HSC পরীক্ষার ৩ মাস আগে সব টিউশনি ছেড়ে দিয়ে, বই নিয়েই বসে থাকতেন সারাক্ষণ। কষ্টের ফসলটা পেয়েছিলেন হাতে নাতেই।
হুট করেই চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান কম্পিউটার সাইন্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো সাবজেক্টে। সেখানেও অর্থকষ্ট ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী।
ভর্তি ফি দিতেন বন্ধুদের কাছ থেকে ধার নিয়ে। এভাবে গ্র্যাজুয়েশন লাইফের শেষ প্রেজেন্টেশন দিয়ে, সেদিন রাতের ট্রেনেই চলে আসেন ঢাকায়।
পিয়ন থেকে শুরু করে এম.ডি পর্যন্ত অন্তত ১ থেকে দেড়শো আবেদন করেন চাকরির জন্য। দেড় মাস পর একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শুরু করেন।
৭ বছর প্রেমের পর ২০১১ সালে বিয়ে করেন কিশোর কুমার দাশ। ভার্সিটি লাইফের মাঝামাঝি থেকেই প্রেম করতেন তারা। কিন্তু সেই সংসার টিকেছিল মাত্র ৬ মাস।
তার স্ত্রী ছিল ধনী পরিবারের মেয়ে। বিলাসী জীবনের চাহিদা পূরন করতে না পারায়, ছেড়ে গিয়েছিল তাকে। ৬ মাসে সংসার ভাঙলেও, তাদের আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ হয়েছে বিয়ের ৪ বছর পর।
স্ত্রী ও ভালোবাসা হারানোর শোক সইতে না পেরে, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির বড় পদে চাকরি নিয়ে, কিশোর কুমার পাড়ি জমান পেরুতে। সেই সময়ে তার বাৎসরিক আয় ছিল প্রায় ১ কোটি টাকা।
এই বিপুল অর্থ সঠিক পথে ব্যয় করতে, মানুষের পাশে দাড়ানোর চিন্তা মাথায় আসে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় দ্বীপতরী নামের এক সংগঠনের যাত্রা। যাদের কাজ ছিল শিশুদেরকে আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষাদান করা।
সেদিনের দ্বীপতরীই আজকের বিদ্যানন্দ। বাকি সাফল্যের গল্পটুকু আমাদের সবার জানা। বর্তমানে কাজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ঠাঁই করে নিয়েছে কোটি মানুষের মনে।
২০১৬ সালে শুরু হয়েছিল বিদ্যানন্দের ভিন্ন এক উদ্যোগ, "এক টাকায় আহার"। এর মাধ্যমে মানবসেবার চিন্তাধারায় রীতিমতো বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে তারা।
দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা যে কোন উৎসবে, অসহায় মানুষদের পাশে সবার আগে পাওয়া যায় বিদ্যানন্দকে। সম্প্রতি কুড়িগ্রামে চালু হয়েছে " এক টাকার রেস্টুরেন্ট" নামে আরেকটি হৃদয়স্পর্শী উদ্যোগ।