বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখার সভাপতি সাদিক কায়েম বলেছেন, ইসলামী ছাত্রশিবিরকে প্রচলিত অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের মতো দেখলে তা হবে ভুল। তিনি উল্লেখ করেন, এটি কোনো শক্তি প্রদর্শনের সংগঠন নয়, বরং আদর্শিক শিক্ষার মাধ্যমে দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তোলার একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প। বৃহস্পতিবার (১০ অক্টোবর ২০২৪) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এ কথা বলেন।
সাদিক কায়েম তাঁর স্ট্যাটাসে লেখেন, “বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের ফ্রেমওয়ার্কে ডিফাইন করলে ভুল হবে। এটি একটি আদর্শিক সংগঠন যেখানে মাঠে ময়দানে শক্তি প্রদর্শন কিংবা কারো ভ্যানগার্ড হওয়ার চর্চা নেই। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো ব্যক্তিগত নৈতিকতার পরিচর্যা করে জাতীয় দায়ভার বিশ্বস্ততার সাথে পালন করার উপযুক্ত মানুষ তৈরি করা।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “শুদ্ধতার মানদণ্ড হিসেবে ছাত্রশিবির নিজেকে উপস্থাপন করে না, বরং ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়েই আমাদের সংগঠন চলে। ইসলামী ছাত্রশিবির এমন একটি সংগঠন, যেখানে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের জায়গায় আদর্শিক বোঝাপড়া পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
সাদিক কায়েম আরও ব্যাখ্যা করেন যে, ছাত্রশিবিরের কার্যক্রম শুধু রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে নৈতিক এবং আধ্যাত্মিক শিক্ষার পাশাপাশি জ্ঞানগত উন্নয়নও সংগঠনের প্রধান প্রায়োরিটি। তাঁর মতে, “ছাত্রশিবির রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরির কাজ করলেও এটি আমাদের একমাত্র বা প্রধান কাজ নয়। ব্যক্তিগত ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নই আমাদের মূল ফোকাস।”
ছাত্রশিবিরের গুণগত উন্নয়নকে সংখ্যার থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, “সংখ্যাতাত্ত্বিক মানোন্নয়নের চেয়ে গুণগত মানোন্নয়ন তথা জ্ঞানগত ও চারিত্রিক উন্নয়নই আমাদের প্রধান প্রায়োরিটি।” তাঁর মতে, একজন আদর্শিক কর্মী হিসেবে শুধু রাজনৈতিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ নয়, বরং একটি বড় উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করতে হবে। সংগঠনের প্রতিটি সদস্যের মধ্যে সঠিক নৈতিকতা, জ্ঞান, এবং চারিত্রিক গুণাবলি বিকাশ ঘটানোই তাদের মূল লক্ষ্য।
ছাত্রশিবিরের আদর্শিক প্রশিক্ষণ দীর্ঘমেয়াদী এবং সুদূরপ্রসারী বলে উল্লেখ করেন সাদিক। তিনি বলেন, “সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক গঠনের যে প্রকল্প, তার প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদী এবং এর ফলাফলও সুদূরপ্রসারী। আমাদের লক্ষ্য শুধু রাজনৈতিক বা তাৎক্ষণিক সুবিধা অর্জন নয়, বরং এক ধীরে ধীরে শিক্ষার মাধ্যমে একটি পরিপূর্ণ দায়িত্বশীল প্রজন্ম গড়ে তোলা।”
সাদিক কায়েমের মতে, ছাত্রশিবির সদস্যদের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। তিনি বলেন, “ছাত্রশিবির কোনো নির্দিষ্ট ‘স্কুল অফ থট’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৈচিত্র্যময় জ্ঞানের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এখানে বিভিন্ন মতের, বিভিন্ন পটভূমির, এবং বিভিন্ন স্বপ্নের ছাত্ররা রয়েছে। তাদের মধ্যে সৃজনশীলতা এবং চারিত্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করি।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ছাত্রশিবির কেবল একাডেমিক পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। “সাহিত্য, সংস্কৃতি, এবং অন্যান্য সহ-শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে আমাদের সদস্যরা একটি বিস্তৃত জগতের সাথে পরিচিত হয়। এই যাত্রা হঠাৎ করে শুরু হয় না, বরং ছোটবেলা থেকেই মৌলিক ভিত্তি গড়ে তোলার মাধ্যমে মহৎ জীবনের প্রশিক্ষণ শুরু হয়।”
ছাত্রশিবিরের সমালোচনা প্রসঙ্গে সাদিক কায়েম বলেন, “আমরা কখনোই শুদ্ধতার মানদণ্ড নই। ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়েই আমাদের সংগঠন চলছে। ঐতিহাসিক ও বর্তমান অবস্থানের দরুণ আমাদের প্রতি সবার প্রত্যাশা বিশাল। সেজন্য প্রায়ই জনপরিসরে সমালোচনা আসে। আমরা সেই সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে দেখি এবং আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তা আমলে নেওয়ার চেষ্টা করি।”
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ছাত্রশিবিরের ওপর রাষ্ট্রীয় সংস্কারকেন্দ্রিক প্রত্যাশা বেড়ে গেছে। এই প্রত্যাশার ভিত্তিতে সংগঠন নিজেকে সংশোধন এবং আরো ভালো করে কাজ করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। “আপনাদের গঠনমূলক সমালোচনাকে আমরা সবসময় ইতিবাচকভাবে পর্যালোচনা করি এবং তা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখি,” বলেন তিনি।
সাদিক কায়েমের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির একটি আদর্শিক সংগঠন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এটি শুধু রাজনৈতিক সংগঠন নয়, বরং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার মাধ্যমে একটি দায়িত্বশীল এবং সৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে। সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে সৃজনশীলতা, চারিত্রিক উন্নয়ন, এবং জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করাই এর মূল উদ্দেশ্য।