রাজনীতি


১৯ দিনে ৬৪ জনসভা: কথোপকথনের রাজনীতি ও ‘ফ্যামিলি ম্যান’ ইমেজে প্রচারে নতুনত্ব আনলেন তারেক রহমান


দূরবিন ডেস্ক

দূরবিন ডেস্ক

প্রকাশিত:১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার

১৯ দিনে ৬৪ জনসভা: কথোপকথনের রাজনীতি ও ‘ফ্যামিলি ম্যান’ ইমেজে প্রচারে নতুনত্ব আনলেন তারেক রহমান

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান । ছবি: সংগৃহীত


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারপর্ব শেষ হয়েছে ১০ ফেব্রুয়ারি। ২২ জানুয়ারি শুরু হওয়া এই প্রচারণায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশজুড়ে অন্তত ৬৪টি জনসভা করেছেন বলে জানিয়েছে দলের মিডিয়া সেল। প্রায় ১৯ দিনের প্রচারে তিনি যে কৌশল নিয়েছেন, তা বাংলাদেশের প্রচলিত নির্বাচনী রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে নতুন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

 

বাংলাদেশের নির্বাচনী জনসভায় সাধারণত নেতা বক্তব্য দেন, সমর্থকেরা শোনেন এই চিরচেনা ধারার বাইরে গিয়ে তারেক রহমান জনসভাকে আলাপচারিতার রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বিভিন্ন জনসভায় তিনি দর্শকসারি থেকে সাধারণ মানুষকে মঞ্চে ডেকে এনে সরাসরি কথোপকথন করেছেন। এলাকার সমস্যা শুনেছেন, প্রশ্ন করেছেন, সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং পুরো জনসভাকে সেই আলোচনায় যুক্ত করেছেন।

 

সিলেটে ২২ জানুয়ারি প্রচারণার উদ্বোধনী জনসভায় তিনি প্রথম এ কৌশল ব্যবহার করেন। সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জের এক যুবককে মঞ্চে ডেকে নিয়ে ধর্মীয় প্রসঙ্গ ঘিরে সংলাপ করেন এবং উপস্থিত জনতার কাছ থেকেও উত্তর নেন। যোগাযোগবিদদের মতে, এই পদ্ধতি জনসভায় তাৎক্ষণিক সম্পৃক্ততা তৈরি করে এবং নেতাকে একমুখী বক্তা নয়, সংলাপকারী হিসেবে উপস্থাপন করে।

 

ঢাকার ভাষানটেক, চট্টগ্রাম, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে শ্রমজীবী মানুষ, নারী ও তরুণদের সঙ্গে একই ধরনের কথোপকথন করেন তিনি। বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর ভাষ্য, জনসভায় সরাসরি মিথস্ক্রিয়া ‘নতুন রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ’, যেখানে নেতা সমস্যার কথা সরাসরি শোনেন।

 

রাজনৈতিক যোগাযোগের ভাষায় এ ধরনের কৌশলকে বলা হয় ‘অডিয়েন্স এনগেজমেন্ট’। আন্তর্জাতিক পরিসরেও এর নজির আছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট Barack Obama নির্বাচনী প্রচারে ‘টাউন হল’ বৈঠকের মাধ্যমে ভোটারদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তরে অংশ নিতেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট Emmanuel Macron–ও বিভিন্ন সময়ে উন্মুক্ত সংলাপে অংশ নিয়েছেন।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক এস এম শামীম রেজা বলেন, পুরোনো দিনেও ইন্টারঅ্যাকটিভ ক্যাম্পেইন ছিল; তবে এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও বিপুল তরুণ ভোটারের উপস্থিতি এ ধরনের প্রচারকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তাঁর মতে, তারেক রহমান ঐতিহ্যগত জনসংযোগ ও আধুনিক ডিজিটাল মনস্তত্ত্ব দুটিকেই সমানভাবে ধরার চেষ্টা করেছেন।

 

দেশে ফেরার পর থেকেই তারেক রহমান শান্তিশৃঙ্খলা ও সহনশীলতার ওপর জোর দিচ্ছেন। সংবর্ধনা অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন জনসভায় তিনি বলেছেন, উসকানির মুখেও শান্ত থাকতে হবে এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। চট্টগ্রামের এক জনসভায় তিনি বলেন, শুধু সমালোচনা করে মানুষের উপকার হয় না; বাস্তব সমাধান দিতে হবে।

 

তবে প্রচারপর্বে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী দল জামায়াতে ইসলামীর মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা ও ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতির সমালোচনাও করেছেন। অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে যেমন কুমিল্লায় ইপিজেড স্থাপনের ঘোষণা, যেখানে আগে থেকেই একটি ইপিজেড রয়েছে।

 

এবারের প্রচারে আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় ছিল পরিবারকে সামনে আনা। স্ত্রী চিকিৎসক জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানকে বিভিন্ন কর্মসূচিতে পাশে রাখা হয়েছে। তাঁরা নারী ও তরুণদের সঙ্গে আলাপ, চা–চক্র, সামাজিক কর্মসূচি ও নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন। পশ্চিমা রাজনীতিতে প্রচলিত এই কৌশলে প্রার্থী নিজেকে একজন দায়িত্বশীল স্বামী ও স্নেহশীল পিতা অর্থাৎ ‘ফ্যামিলি ম্যান’ হিসেবে উপস্থাপন করেন।

 

যোগাযোগবিদদের মতে, এটি প্রার্থীর কঠোর রাজনৈতিক ইমেজকে নরম করে এবং তাঁকে একজন সাধারণ, নির্ভরযোগ্য মানুষ হিসেবে তুলে ধরতে সহায়তা করে।

 

প্রচারের শেষ দিনে বিটিভিতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে অতীতের ভুলত্রুটির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থেকে অনিচ্ছাকৃত ভুল করে থাকলে তার জন্য তিনি দেশবাসীর কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখিত এবং ভবিষ্যতে সেসব থেকে শিক্ষা নেওয়া হবে।


সম্পর্কিত

রাজনীতিতারেক রহমানবিএনপি

জনপ্রিয়


রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

‘জামায়াতের দুঃখ আমির হামজা, এনসিপির দুঃখ নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী’

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী-এর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

শফিকুর রহমান: ‘সংসদ মানুক বা না মানুক, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করব’

বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, জনগণের ভোটের রায় অমান্য করা হলেও তারা গণভোটের ফল বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তিনি সোমবার (৬ মার্চ) ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা জানান।

আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকছে, এর প্রভাব কেমন হবে

আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকছে, এর প্রভাব কেমন হবে , বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল সেটি সংশোধিত আকারে সংসদে পাশের জন্য সুপারিশ করেছে বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক গঠিত বিশেষ কমিটি।

তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক, নির্বাচনের পর প্রথম আনুষ্ঠানিক সভা

নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম বৈঠকে বসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক শনিবার (৪ এপ্রিল) রাত ৮টার কিছু আগে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে শুরু হয়।