অন্য ফুটবলাররা যখন বলের জন্য মাঠের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটছেন, মেসিকে তখন দেখা যায় দাঁড়িয়ে থাকতে বা আনমনে হাঁটতে।
তবে তিনি যে মাঠে অলসতার জন্য হাঁটেন তা কিন্তু নয়। কিংবা সবসময় দৌড়ানোর জন্য তার শরীর ফিট নয়, এমনটাও নয়।
মূলত হেঁটে হেঁটেই মেসি নিজের কাজ সেরে ফেলেন। এর মাধ্যমে চিন্তা-ভাবনা করে প্রতিপক্ষের কয়েক ধাপ আগে এগিয়ে থাকতে চান।
মেসির এই পর্যবেক্ষণ যে কতটা কার্যকর, তার প্রমাণ আর্জেন্টিনার দুর্দান্ত পারফর্মেন্স। কাতার বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচেই আর্জেন্টিনার জয়ে অবদান রাখছেন লিওনেল মেসি।
শুধু পারফরম্যান্সের বিচারে নয়, ঠান্ডা মেজাজের ফুটবলার হিসেবেও সর্বকালের সেরাদের একজন লিও।
মাঠে যা-ই ঘটুক না কেন, সেদিকে মন না দিয়ে পুরো মনোযাোগটা তিনি বলের দিকেই দেন। বিশেষ করে হাঁটার সময় প্রতিপক্ষের অবস্থান বুজতে চেষ্টা করেন তিনি।
বল পেলে দৌড়ান, ড্রিবলিং করেন। কখনো আবার প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নিতে ছোটেন। বাকি সময়টা হাঁটেন কিংবা দাঁড়িয়ে থাকেন। এটাই মেসির খেলার ধরন।
আর এ ব্যাপারটা বেশ ভালোভাবেই জানেন মেসির সাবেক কোচ পেপ গার্দিওলা। তার মতে, মেসির দাঁড়িয়ে থাকা একটি গোলকধাঁধা।
তিনি বলেন, মেসি দৌড়াচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু সে দেখছে সবসময়। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের কোথায় দুর্বলতা আছে সেটি খুঁজে, পাঁচ থেকে দশ মিনিটের মধ্যে তার মাথায় একটি মানচিত্র তৈরি করে ফেলে, কোথায় ফাঁকা জায়গা আছে।
আর তাতেই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করেন এল এম টেন। শান্ত মাথায় হিসেব কষে মাঝ মাঠের দূরত্ব পেরিয়ে বল পৌঁছে দিচ্ছেন প্রতিপক্ষের জালে।
ম্যাচ চলাকালীন সময়ে কেন এত হাঁটেন এ নিয়ে বেশ কয়েকবার আলোচনায় এসেছেন আর্জেন্টাইন তারকা।
সম্প্রতি গ্রুপপর্বের ম্যাচগুলোতে কে সবচেয়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করেছেন, এরকম একটি পরিসংখ্যান করা হয়।
যেখানে দেখা যায়, মেসির ৩টি ম্যাচের দূরত্বই সেরা দশে জায়গা করে নিয়েছে, দ্বিতীয়, পঞ্চম এবং নবম স্থানে। ম্যাচ প্রতি প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটারের বেশি পথ হাঁটেন মেসি।
সৌদি আরবের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হারের দিন মেসি হেঁটেছেন ৪ হাজার ছয়শো সাতাশ মিটার। পোল্যান্ডের বিপক্ষে হেঁটেছেন সাড়ে ৪ কিলোমিটারেরও বেশি।
আর মেক্সিকোর বিপক্ষে হেঁটেছেন সর্বোচ্চ ৪ হাজার নয়শো আটানব্বই মিটার। যা প্রায় ৫ কিলোমিটার।
অবশ্য কাতার বিশ্বকাপে মেসির থেকে বেশি হেটেছেন পোল্যান্ডের লেভানদভস্কি। সৌদি আরবের বিপক্ষে ৫ হাজার দুইশো দুই মিটার হেটেছেন এই ফরোয়ার্ড।
ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে এসেও দুর্দান্ত মেসি। প্রতিনিয়ত বিস্ময় উপহার দিয়ে চলেছেন এ আর্জেন্টিনা অধিনায়ক।
যেভাবে দলের তরুণদের সঙ্গে সমন্বয় করে বল কেড়ে নিতে ঝাঁপাচ্ছেন, তাতে কে বলবে তার বয়স ৩৫!
সৌদি আরবের কাছে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বাদ পড়ার শঙ্কা জাগে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মরুর বুকে পা রাখা আর্জেন্টাইনদের। কিন্তু খাঁদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই দলকে টেনে তুললেন মেসি নামের জাদুকর।
গতকাল লুসাইল স্টেডিয়ামে ক্রোয়েশিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে পা রাখে মেসিরা। সেখানেও নিজে গোল দেয়ার পাশাপাশি অন্যকে গোল দিতে সহায়তা করেছেন তিনি।
মেসির বাঁ পায়ের জাদুতে আর্জেন্টিনা এখন ৩৬ বছরের অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটানোর স্বপ্ন দেখছে। এখনো ৩৫ বছর বয়সী মেসির ম্যাজিকে আস্থা রয়েছে সকলের।