বাংলাদেশ


নদী রক্ষার নামে নদী হত্যা: দুধকুমার নদী প্রকল্পে ১৫ কোটি টাকা নিয়ে ঠিকাদার পলাতক


দুরবীন ডেস্ক

দুরবীন ডেস্ক

প্রকাশিত:২২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৯:৫২ পূর্বাহ্ন, সোমবার

নদী রক্ষার নামে নদী হত্যা: দুধকুমার নদী প্রকল্পে ১৫ কোটি টাকা নিয়ে ঠিকাদার পলাতক

নদী রক্ষার কথা বলে উল্টো নদীর বুকে ‘কবর’ খোঁড়ার অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রামের দুধকুমার নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে। সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের বলদী পাড়া এলাকায় প্রায় ১৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প এখন স্থানীয়দের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘নদী হত্যার প্রকল্প’ নামে। সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার বদলে মাঝ বরাবর বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে নদীর তলদেশ উঁচু করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে স্রোত কার্যত বন্ধ হয়ে নদীটি মৃতপ্রায় জলাভূমিতে পরিণত হয়েছে।

 

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), কুড়িগ্রাম এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। প্রকল্পটির আওতায় দুধকুমার নদীর ডান তীরের ৫০০ মিটার অংশে নদীশাসনের কাজ করার কথা ছিল।

 

প্রকল্পের বিবরণ অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার দুধকুমার নদীর ডান তীর ৪২৮২০ থেকে ৪৩৩২০ কিলোমিটার এলাকায় কাজটি বাস্তবায়নের জন্য চুক্তি মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১৪ কোটি ৮৯ লাখ ৭১ হাজার ৬৬৯ টাকা। টেন্ডার আইডি ৭৪৪৪০২৫, প্যাকেজ কুড়ি দুধকুমার ডাবলু–৪৮। কাজের সময়কাল ধরা হয় জানুয়ারি ২০২৩ থেকে জুন ২০২৫। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পায় আর ইউ এস এইচ জেভি, যার প্রতিনিধি মো. মোস্তাফিজার রহমান সাজু।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ,

নদী খননের বদলে নদীর মাঝখানে লক্ষাধিক জিও ব্যাগ ফেলে ভরাট করা হয়েছে। এতে নদীর স্বাভাবিক গভীরতা নষ্ট হয়ে পানির চলাচলের পথ রুদ্ধ হয়েছে। বলদী পাড়ার বাসিন্দা শাজাহান আলী বলেন, নদীর পেট কেটে বাঁচানোর বদলে নদীর পেটে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ঢুকিয়ে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। এখন এই নদী শুধু নামেই নদী।

 

সরেজমিনে দেখা গেছে, জিও ব্যাগের স্তূপে নদীর বিভিন্ন স্থানে চর তৈরি হয়েছে। বর্ষায় যেখানে প্রবল স্রোত থাকার কথা, সেখানে এখন পানির অস্তিত্বই নেই। জেলে অমলেশ চন্দ্র বলেন, নদী শুকিয়ে গেছে, মাছ নেই, স্রোত নেই। আমাদের জীবিকাই শেষ হয়ে গেছে।

 

এলাকাবাসীর দাবি, প্রকল্পের ঠিকাদার মো. মোস্তাফিজার রহমান সাজু বর্তমানে পলাতক এবং একাধিক মামলার আসামি। তার অনুপস্থিতিতেই নদীর বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিতভাবে জিও ব্যাগ ফেলে কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, ঠিকাদার পলাতক থাকলেও কীভাবে বিল পরিশোধ হলো এবং কার অনুমতিতে কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করা হলো।

 

প্রকল্প বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের দায়িত্বে ছিলেন পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাকিবুল হাসান, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী আব্দুল কাদের ও মো. শরিফুল ইসলাম। স্থানীয়দের অভিযোগ, কার্যকর তদারকির অভাবে ঠিকাদার ইচ্ছামতো কাজ করেছেন এবং অনিয়মের অভিযোগ বারবার উঠলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

 

Related posts here

 

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাকিবুল হাসান বলেন, ডিজাইন অনুযায়ী ও নিয়ম মেনেই কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।

 

তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ের পর নদীর প্রবাহ বন্ধ, মাছের প্রজনন ধ্বংস এবং জেলে ও মাঝিদের জীবন জীবিকা সংকটে পড়েছে। যাত্রাপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ময়েন উদ্দিন ভোলা বলেন, এই প্রকল্প তদন্ত হলে শুধু ঠিকাদার নয়, আরও অনেকের মুখোশ খুলে যাবে।

 

এলাকাবাসী ও সচেতন মহল দাবি জানিয়েছে, প্রকল্পটি নিয়ে দুদকের মাধ্যমে স্বাধীন তদন্ত, নদীর মাঝখান থেকে সব জিও ব্যাগ অপসারণ, দুধকুমার নদীর বৈজ্ঞানিক খনন ও প্রবাহ পুনরুদ্ধার এবং অনিয়মে জড়িত কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

কুড়িগ্রাম জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক লিয়াকত আলী বলেন, জেলায় নদীশাসনের নামে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প চলছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই মূল ঠিকাদার কাগজে থাকলেও মাঠে দালালদের মাধ্যমে কাজ হচ্ছে। বলদী পাড়ার প্রকল্পটি নিয়েও অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি দুদকের মাধ্যমে তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে আহ্বান জানানো হবে।

 

দুধকুমার নদীর বর্তমান অবস্থা স্থানীয়দের চোখে কেবল একটি নদীর মৃত্যু নয়, বরং দুর্নীতি ও ভুল উন্নয়ন দর্শনের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।


সম্পর্কিত

নদীকুড়িগ্রামপানি সম্পদ মন্ত্রণালয়

জনপ্রিয়


বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন

ট্যাক্স ফাঁকির অভিযোগে ‘ঘরের বাজার’কে ৭.৮৭ লাখ টাকা জরিমানা

আয়কর সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে দেশের পরিচিত ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ‘ঘরের বাজার’-কে ৭ লাখ ৮৭ হাজার ৫১৪ টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির কিছু পণ্যের মান ও বিপণন পদ্ধতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোক্তাদের একাংশ বিভিন্ন অভিযোগ তুলেছেন।

বিএসটিআই পরীক্ষায় হায়ারের ২ টনের এসিতে কম কুলিং ক্ষমতার অভিযোগ

রাজধানীর গুলশানে পরিচালিত বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) এক অভিযানে অনুমোদনহীন পণ্য বিক্রির দায়ে হায়ার বাংলাদেশ লিমিটেডকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই অভিযানে জব্দ করা দুটি ২ টনের এয়ার কন্ডিশনার (এসি) পরীক্ষার পর ঘোষিত কুলিং ক্ষমতার সঙ্গে প্রকৃত সক্ষমতার অমিল পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

অনুমোদনহীন খাদ্যপণ্য বিক্রি, আগোরাকে এক লাখ টাকা জরিমানা

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর অনুমোদন ছাড়াই বেকিং পাউডার, আইসিং সুগার ও কাস্টার্ড পাউডার বিক্রির অভিযোগে দেশের অন্যতম রিটেইল সুপারস্টোর চেইন আগোরা লিমিটেডকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

জাতীয় জাদুঘরে প্রদর্শিত মেসির স্বাক্ষরিত জার্সি, ভিড় করছেন ফুটবলপ্রেমীরা

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসির স্বাক্ষর করা আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের একটি জার্সি এখন প্রদর্শিত হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে। বিরল এই স্মারকটি দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন শত শত দর্শনার্থী। বিশেষ করে মেসি-ভক্ত ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে জার্সিটি ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে।