বাংলাদেশ


তরুণদের চোখে নির্বাচন: বাংলাদেশ কোন পথে যাবে


ক্যাম্পাস প্রতিনিধি

ক্যাম্পাস প্রতিনিধি

প্রকাশিত:১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার

তরুণদের চোখে নির্বাচন: বাংলাদেশ কোন পথে যাবে

ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা । ছবি: দূরবিন নিউজ


জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা এখন সর্বত্র। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ও কর্মসূচির পাশাপাশি দেশের তরুণ প্রজন্ম কী ভাবছে তা এই মুহূর্তে সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের কর্মশক্তি, নীতিনির্ধারক ও নাগরিক সমাজের প্রধান চালিকাশক্তি।

 

চারজন ভিন্ন প্রেক্ষাপটের শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে এমন এক বাংলাদেশ ভাবনার প্রতিচ্ছবি, যেখানে উন্নয়ন শুধু অবকাঠামোতে সীমাবদ্ধ নয় মানবসম্পদ, সংস্কৃতি, সুশাসন ও বৈশ্বিক অবস্থানের সমন্বয়েই নির্ধারিত হবে দেশের ভবিষ্যৎ পথ।

 

ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুন নাহার মনে করেন, সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকলেও খাতভিত্তিক ভারসাম্যের ঘাটতি স্পষ্ট। তাঁর ভাষায়, কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এই তিনটি মৌলিক খাতে বরাদ্দ ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে এখনো বড় ফাঁক রয়ে গেছে।

 

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখনো একটি কৃষিনির্ভর দেশ। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষি খাতে কাগুজে প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি ব্যবহার, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থায় বাস্তব বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির গুরুত্ব তুলে ধরেন।

 

জান্নাতুন নাহারের মতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; এটি প্রায় ১৮ কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণের মুহূর্ত। তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাত দেশের বড় শক্তি হলেও ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আইটি খাত, ফ্রিল্যান্সিং ও কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তি শিক্ষায় যুক্ত করার ওপর তিনি জোর দেন।

 

আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রাকিবুল হাসান চাঁদের দৃষ্টিতে নির্বাচন মানে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের রূপরেখা। তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে দক্ষতা উন্নয়ন ও চাকরির বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া ইতিবাচক ইঙ্গিত।

 

তার মতে, উন্নয়ন শুধু সেতু বা মহাসড়ক নয়; টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো দক্ষ মানবসম্পদ। নবম শ্রেণি থেকেই কারিগরি প্রশিক্ষণ, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চাকে শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব তরুণদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তুলতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

 

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি অনেক ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার ফল। কৃষক ও ভোক্তার দামের ব্যবধান কমাতে সরাসরি সরকারি ক্রয়-বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপনের মতো উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে বলে তাঁর অভিমত।

 

সংস্কৃতি

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সিয়াম উন্নয়ন আলোচনায় সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর মতে, একজন সচেতন ভোটার হিসেবে তিনি এমন সরকার চান, যারা দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সৃজনশীল স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেবে।

 

তিনি বলেন, নাটক, সিনেমা, গান ও লোকসংস্কৃতি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয় এসবই জাতির ইতিহাস ও পরিচয়ের ধারক। কিন্তু অনেক সময় সংস্কৃতিকে বিলাসিতা হিসেবে দেখা হয়, যার ফলে সৃজনশীল মানুষ বাধাগ্রস্ত হন।

 

তরুণ নির্মাতা, ইউটিউবার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের তিনি দেশের সাংস্কৃতিক ভবিষ্যতের বাহক হিসেবে দেখেন। রাজধানীকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক চর্চার বাইরে জেলা পর্যায়ে থিয়েটার, ফিল্ম স্কুল ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

 

সুশাসন, আস্থা ও ব্রেইন ড্রেইন

সৌদি আরবের কিং আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী এম. মিজানুর রহমান মনে করেন, একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নাগরিক আস্থা পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত।

 

তার ভাষায়, সুশাসন ও দুর্নীতি দমন ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না। সড়ক-সেতুর পাশাপাশি ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও আইনের সমান প্রয়োগই প্রকৃত উন্নয়নের মাপকাঠি।

 

তিনি বলেন, দুর্নীতি ও বৈষম্য স্বাভাবিক হয়ে গেলে মেধা ও পরিশ্রমের মূল্য কমে যায়, যার ফল হিসেবে বাড়ে ব্রেইন ড্রেইন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত হলেই তরুণরা দেশেই ভবিষ্যৎ গড়তে আগ্রহী হবে।

 

তরুণদের অভিন্ন বার্তা

চারজন শিক্ষার্থীর ভাবনায় বিষয় আলাদা কৃষি ও প্রযুক্তি, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান, সংস্কৃতি কিংবা সুশাসন। তবে তাদের বক্তব্যে একটি অভিন্ন সুর স্পষ্ট: নির্বাচন তাদের কাছে কেবল সরকার পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নয়, বরং বাংলাদেশের উন্নয়নের ধরন নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

 

তারা এমন এক রাষ্ট্র চায়, যেখানে উন্নয়ন মানে শুধু দৃশ্যমান অবকাঠামো নয়; মানবসম্পদ, সৃজনশীলতা, ন্যায়বিচার ও আস্থার সমন্বিত অগ্রযাত্রা। যে বাংলাদেশ প্রযুক্তিতে এগোবে, সংস্কৃতিকে আগলে রাখবে, সুশাসন নিশ্চিত করবে এবং তরুণদের স্বপ্ন দেখার ও তা বাস্তবায়নের সুযোগ দেবে সেই বাংলাদেশের দিকেই তাদের প্রত্যাশা।

 

  • প্রতিবেদন: মো. হৃদয়, ডিআইইউ প্রতিনিধি

জনপ্রিয়


বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন

অসহায় সামিয়ার পাশে দাঁড়ালো স্বপ্ন

লালমাই উপজেলার ২ নং বাগমারা দক্ষিণ ইউনিয়নের পোহনকুছা পশ্চিম পাড়ার ১২ বছর বয়সী অসহায় মেয়ে সামিয়া আক্তারের পাশে দাঁড়িয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় রিটেইল প্রতিষ্ঠান স্বপ্ন। প্রতিষ্ঠানটি মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে সামিয়ার জন্য প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদানের একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

নগদের ক্যাম্পেইনে হেলিকপ্টার ভ্রমণের স্বপ্ন সত্যি হলো ইমন ও আফজালের

পবিত্র রমজান উপলক্ষে নগদ গ্রাহকদের জন্য বিশেষ ক্যাম্পেইনের আয়োজন করা হয়, যেখানে কেনাকাটা করে নগদ ওয়ালেট ব্যবহারকারীরা হেলিকপ্টার ভ্রমণের আকর্ষণীয় পুরস্কার জিততে পারতেন। এই ক্যাম্পেইনের মূল বিজয়ী হয়েছেন ঢাকার দুই গ্রাহক কাজী ইমন ও আফজাল হোসেন।

হাওরে ডুবে যাচ্ছে বোরো ধান, গবাদিপশুর খাদ্যে পরিণত কৃষকের স্বপ্ন

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে টানা বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্টি হওয়া জলাবদ্ধতায় অপরিপক্ক বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। কৃষকেরা বাধ্য হয়ে কোমর পর্যন্ত পানিতে নেমে কাঁচা ধান কেটে গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করছেন।

শিরীন শারমিন চৌধুরী গ্রেফতারের আগে প্রায় দেড় বছর “আত্মগোপনে”কোথায় ছিলেন?

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের দুই বছর পর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রেফতার করেছে। মঙ্গলবার ভোর সাড়ে চারটায় ধানমন্ডি এলাকার নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় তাকে। এরপর তাকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়।