বাংলাদেশ


ব্যাটল ফর থ্রোন: রহমান বনাম রহমান


দূরবিন ডেস্ক

দূরবিন ডেস্ক

প্রকাশিত:১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার

ব্যাটল ফর থ্রোন: রহমান বনাম রহমান

ছবি: সংগৃহীত


বৃহস্পতিবার ভোরের আলো ফুটতেই বাংলাদেশ জেগে উঠছে এমন এক দিনে, যাকে অনেকে অভিহিত করেন 'গণতন্ত্রের উৎসব' হিসেবে। দেড় বছরব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতার পর অবশেষে ভোটের পথে দেশ। প্রায় ১৭ বছর একদলীয় আধিপত্যের রাজনীতির পর কোটি কোটি ভোটারের কাছে এটি তাদের সম্মিলিত কণ্ঠ পুনরুদ্ধারের এক বহুল প্রতীক্ষিত সুযোগ।

 

এবারের নির্বাচন কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়; একই সঙ্গে এটি একটি সাংবিধানিক গণভোটেরও পরীক্ষা 'হ্যাঁ' অথবা 'না' ভোট, যা রাষ্ট্র কাঠামোর ভবিষ্যৎ রূপ নির্ধারণ করতে পারে।

 

অনেকের কাছে এই ভোট উৎসব উইনস্টন চার্চিলের সেই 'লিটল ম্যান'-এর সংজ্ঞায়িত মুহূর্ত। এই নির্বাচনের পণ অত্যন্ত উচ্চ। ২০১৪ সালের পর টানা তিনটি বহুল বিতর্কিত নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রক্ত ও অশ্রুস্নাত গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর—ভোটারদের কাছে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে। ফলস্বরূপ প্রত্যাশার পারদও আকাশচুম্বী: এই প্রত্যাশা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি থেকে স্বস্তি এবং জননিরাপত্তার পুনঃপ্রতিষ্ঠার।

 

মঙ্গলবার সকাল থেকে হাই ভোল্টেজ নির্বাচনি প্রচার শেষ হওয়ার পর লড়াইটি স্পষ্টতই রূপ নেয় শীর্ষ দুই ব্যক্তি—বিএনপির তারেক রহমান এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শফিকুর রহমানের দ্বৈরথে। একসময়ের মিত্র এই দুই দল এখন মসনদের জন্য লড়াইয়ের আপসহীন প্রতিদ্বন্দ্বী; রাষ্ট্রক্ষমতার লড়াই যেন এক 'জিরো-সাম' সংগ্রাম। অর্থাৎ, জিতলে সবকিছু, হারলেই রিক্ত হস্ত।

 

যারা একসময় একই রাজনৈতিক জোটে ছিলেন, তারাই এখন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের তিক্ত সংগ্রামে প্রতিদ্বন্দ্বী। বাংলাদেশের পুরোনো রাজনৈতিক বাস্তবতায় জয় কেবলই সবকিছু নয়, এটাই একমাত্র সম্বল। তাই 'জিরো-সাম গেম' কিংবা 'উইনার টেকস অল'—এই পরিভাষাগুলো নির্বাচনি রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করতে বারবার ফিরে আসে। বাংলাদেশের সংঘাতপ্রবণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচন খুব বিরল ক্ষেত্রেই সমঝোতা বা সহাবস্থানের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের রাজনীতি মূলত 'জিতলে সব, হারলে কিছুই নয়'—এই নীতিনির্ভর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেই ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। ভোটগ্রহণ শুরুর আগেই প্রায় নিশ্চিত—একজন রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসবেন, অন্যজনকে নেতৃত্ব দিতে হবে বিরোধী শিবিরকে।

 

তারেকের প্রত্যাবর্তন

৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরেন। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্বে এসে তাঁর মিশন স্পষ্ট—প্রায় দুই দশক পর বিএনপিকে আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা।

 

তিনি প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসন থেকে। বিএনপি জিতলে তিনি প্রধানমন্ত্রী; হারলে হবেন বিরোধীদলীয় নেতা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও দেশের কিছু সংস্থার জরিপ তাঁকে এগিয়ে রাখলেও—এসব জরিপের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

 

২০ দিনের আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচারকালে তিনি দেশজুড়ে ডজনখানেক সমাবেশে ভাষণ দেন। ফ্যামিলি কার্ড, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন এবং অর্থনীতি স্থিতিশীল করার প্রতিশ্রুতি ছিল তাঁর বক্তৃতার মূল সুর।

 

জামায়াতের সুযোগের মুহূর্ত

৬৭ বছর বয়সী ডা. শফিকুর রহমানের জন্য এই নির্বাচন একই সঙ্গে অতীতের গ্লানিমোচন ও সুযোগ। ২০০১ ও ২০১৮ সালে তিনি সংসদীয় আসনে জয়লাভে ব্যর্থ হন। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ভূমিধস বিজয় পেলেও—মৌলভীবাজার-২ আসনে তিনি দলীয় দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে মাত্র ৭ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। সে নির্বাচনে মূল লড়াই হয়েছিল বিএনপিপন্থী স্বতন্ত্র প্রার্থী ও আওয়ামী লীগ প্রার্থীর মধ্যে। বিএনপিপন্থী স্বতন্ত্র প্রার্থী ৭৮ হাজার ৬৬৭ ভোট (মোট প্রদত্ত ভোটের ৪৫.৫০ শতাংশ) পেয়ে জয়ী হন, আর আওয়ামী লীগ প্রার্থী পান ৭১ হাজার ৮০৩ ভোট (৪১.৫৩ শতাংশ)। সেখানে শফিকুর রহমান পান মাত্র ১২ হাজার ৪১৫ ভোট—যা ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক ফল।

 

জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় ২০১৮ সালে তিনি বিএনপির প্রতীক 'ধানের শীষ' নিয়ে নির্বাচন করেন। সে সময় বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের গুরুত্বপূর্ণ শরিক হিসেবে জামায়াতের এই নেতা ঢাকা-১৫ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বহুল আলোচিত 'মধ্যরাতের নির্বাচন' হিসেবে পরিচিত ওই ভোটে তিনি জামানত রক্ষা করতে সক্ষম হলেও জয় পাননি।

 

আজকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ; ফলে জামায়াতের সামনে ঐতিহাসিক এক বিস্তারের সুযোগ। শফিকুর রহমান যদি ঢাকা-১৫ আসনে জিতেন, সেটি হবে তাঁর সংসদে প্রথম প্রবেশ। আর জাতীয়ভাবে জামায়াত জয়ী হলে—তিনি হবেন প্রধানমন্ত্রী; যা একসময় দলটির জন্য অকল্পনীয় ছিল।

 

এমনকী পূর্ণ বিজয় না পেলেও—জামায়াত সংসদের ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে শক্তিশালী উপস্থিতি গড়তে পারে এবং প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

 

তীব্র উত্তেজনার প্রচার

২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর পর থেকে ২০ দিনে তারেক ও শফিকুর দেশজুড়ে নিরলস প্রচার চালান। শেষ মুহূর্তে তা রীতিমতো উত্তেজনার চূড়ায় পৌঁছে।

 

তারেক সিলেট থেকে প্রচার শুরু করে সাতটি সফরে ২৬ জেলায় প্রায় ৩০টি নির্বাচনি সমাবেশ করেন। ঢাকাতেও ২০টির বেশি সমাবেশে বক্তব্য দেন। এসব সমাবেশে তিনি বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ফ্যামিলি কার্ড, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলো তুলে ধরেন।

 

তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ডা. শফিকুর নিজ আসন থেকে প্রচার শুরু করে ২০ দিনে ৬০টি সমাবেশ করেন। দুর্নীতি-চাঁদাবাজিমুক্ত কল্যাণরাষ্ট্র গঠন, নারীর নিরাপত্তা—এসব ছিল তাঁর ভাষণের কেন্দ্রবিন্দু।

 

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে মোটেও 'ভ্রাতৃপ্রতিম' রাখেনি। উভয় শিবিরই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। জামায়াত অভ্যন্তরীণ কোন্দলমুক্ত; বিএনপি প্রায় চার ডজন বিদ্রোহী প্রার্থীর ঝুঁকি সামাল দিতে ব্যস্ত।

 

তাঁদের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা ইতোমধ্যেই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে তথাকথিত 'ভ্রাতৃসুলভ' প্রতিযোগিতা থেকে অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছে। জয়ের লক্ষ্যে এখন তাঁরা দুজনই নিজেদের ঘোর সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে উৎকণ্ঠাপূর্ণ সময় পার করছেন।

 

এই লড়াইয়ে জামায়াতে ইসলামী তুলনামূলকভাবে অভ্যন্তরীণ কোন্দলমুক্ত অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি পড়েছে ভিন্ন চাপে। মনোনয়ন না পাওয়া প্রায় চার ডজন বিদ্রোহী প্রার্থী দল বা জোটের মনোনিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিচ্ছেন, যেকারণে সম্ভাব্য ঝুঁকি কমাতে বিএনপিকে বাড়তি হিসাব-নিকাশ কষতে হচ্ছে।

 

আগের মতোই অর্থ, পেশিশক্তি এবং ধর্মের ব্যবহার নির্বাচনি প্রচারণায় প্রাধান্য পেয়েছে, যেখানে নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনি আইন ও বিধি প্রয়োগের দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সময় সম্মুখসারিতে থাকা নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ অযৌক্তিকভাবে কমে যাওয়া নিয়েও তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু অন্য দিকে একটি ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে—ইসলামী দলগুলোর প্রার্থীদের অংশগ্রহণ এবারে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

 

বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মাঝেও ইতিবাচক দিকটি হলো—অবশেষে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা গত দেড় বছরের অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতার অবসান ঘটাতে পারে। তবে এখনও অনেকেই নির্বাচনের মান নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। বিস্তৃত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরালোভাবে কার্যকর করা হলেও— সাধারণ মানুষের মনে সহিংসতার ভীতি এখনো উচ্চমাত্রায় বিরাজ করছে। এমনকি পুলিশ প্রধানও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের অর্ধেকের বেশি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং, এই নির্বাচন কেমন হবে—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো বিরাজ করছে। নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে জনমনে সন্দেহের দোলাচাল আরও বেড়েছে, যা প্রধান উপদেষ্টার "সর্বকালের সেরা ও ঐতিহাসিক" নির্বাচনের প্রত্যাশার ওপর ছায়া ফেলছে। 

 

বিএনপি না জামায়াত?

শফিকুরের নেতৃত্বে জামায়াত কি তারেকের নেতৃত্বাধীন বিএনপিকে হারিয়ে এই লড়াইয়ে জিততে পারবে, যে দলটি ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনবার নির্বাচনে জয়ী হয়েছে? জামায়াতের এমন কোনো রেকর্ড নেই।

 

অতীত নির্বাচনে জামায়াতের নির্বাচনি পারফরম্যান্স ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জন্য খুব একটা আশা দেখায়নি। ১৯৯১ সালের পর থেকে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত চারটি নির্বাচনের মধ্যে, যেগুলোকে সাধারণত সুষ্ঠু ও ন্যায্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে—আওয়ামী লীগ এবং তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি—প্রত্যেকেই দুটি করে নির্বাচনে জিতেছে।

 

বিএনপি জিতেছে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে, আর আওয়ামী লীগ জিতেছে ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে। ভোট ও আসনের সংখ্যার দিক থেকে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল আ. লীগ বা বিএনপির নির্বাচনি পারফরম্যান্সের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি।

 

জাতীয় পার্টি ও জামায়াত কখনোই আওয়ামী লীগ বা বিএনপির জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেনি। এদের মধ্যেও জাতীয় পার্টি তৃতীয় অবস্থানে থাকলেও—জামায়াত সবসময়ে চতুর্থ অবস্থানেই সীমাবদ্ধ ছিল।

 

১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর জাতীয় পার্টি ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছিল আওয়ামী লীগের সহায়তায়; আর জামায়াত ২০০১ সালে একবার বিএনপির সঙ্গে জোট গঠন করে সরকারে এসেছিল। সেই সময়ের জামায়াতের দুই শীর্ষ নেতা — মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদকে—হাসিনা সরকারের আমলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। যারা জিয়ার কেবিনেটের মন্ত্রীও ছিলেন।

 

ক্ষমতার দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে একটি দল— আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অনুপস্থিত। তাই অন্তত তাত্ত্বিকভাবে হলেও এই রেসকে বিএনপির অনায়সে একপক্ষীয় বলে ধরা হচ্ছে। চারটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্যে, ১৯৯৬ সালের জুন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল এবং যথাক্রমে ৩৭.৪৪% এবং ৪০.১৩% ভোট পেয়েছিল। বিএনপি তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এককভাবে অংশগ্রহণ করে যথাক্রমে ৩০.৮১% এবং ৩৩.৬০% ভোট পেয়েছিল।

 

উভয় দলের নির্বাচনি পারফরম্যান্সের একটি সাধারণ দিক হলো, পরবর্তী নির্বাচনে তাদের ভোটের শতাংশ বেড়েছে; যা তাদের ক্ষমতায় নেওয়া পূর্ববর্তী নির্বাচনের তুলনায় বেশি ছিল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচন আওয়ামী লীগ জিতেছিল, কিন্তু ২০০১ সালে হেরেছিল। বিএনপি ১৯৯১ সালে জিতেছিল, কিন্তু ১৯৯৬ সালে পরাজিত হয়েছিল। উভয় দলই তাদের পরাজিত নির্বাচনে ভোটের ভাগ বাড়তে দেখেছিল।

 

২০০১ ও ২০০৮ সালের অন্য দুটি নির্বাচনে যথাক্রমে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জয়ী হয়, যেখানে তারা অন্যান্য দলের সঙ্গে জোট গঠন করেছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জামায়াত, জাতীয় পার্টির একাংশ এবং ইসলামী ঐক্য জোটের সঙ্গে জোট গঠন করেছিল।

 

২০০৮ সালের নির্বাচনে, আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি এবং অন্যান্য কয়েকটি দলের সঙ্গে জোট গঠন করে, যার মধ্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল এবং ওয়ার্কার্স পার্টির মতো দলও ছিল।

 

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দু'পক্ষই তাদের জোটসঙ্গীদের জন্য কিছু আসনে ছাড় দিয়েছিল। অন্য যে আসনগুলোতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, সেখানে তারা তাদের জোটসঙ্গীদের ভোটব্যাংক থেকে ভোট পান।

 

এই দুই দলের প্রকৃত শক্তি প্রতিফলিত হয় সেইসব নির্বাচনে যেখানে তারা কোনো জোট গঠন না করেই লড়েছিল।

 

যদি সেই ফলাফলগুলিকে বিবেচনায় নেওয়া হয়, তাহলে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের ভোটব্যাঙ্ক প্রায় ৩৭% থেকে ৪০% ভোটার। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে যথাক্রমে ৩০.৮১% এবং ৩৩.৬০% ভোট পেয়েছিল। এই তথ্য দেখায় যে, দুটি দল একসাথে ৭০%-এর বেশি ভোটের দাবিদার।

 

নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত চারটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের মধ্যে জামায়াত কেবল প্রথম দুটি নির্বাচনে স্বতন্ত্রভাবে অংশগ্রহণ করেছিল—১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে। বাকি দুটি নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের অধীনে অংশ নিয়েছিল ২০০১ ও ২০০৮ সালে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামাত ১৮টি আসন জিতেছিল এবং ১২.১৩% ভোট পেয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৬ সালে পারফরম্যান্স আরও খারাপ হয়, তখন তারা মাত্র ৩টি আসন পায় এবং ভোটের হার নেমে যায় ৮.৬১%-এ। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়ে জামায়াত ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন পেয়ে ১৭টি আসন পায়; কিন্তু ২০০৮ সালে মাত্র ২টি আসনই জিততে সক্ষম হয়। শেষ দুটি নির্বাচনে জামায়াতের প্রকৃত সমর্থন পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি, কারণ তারা সব নির্বাচনি আসনে প্রার্থী দিতে পারেনি।

 

সুতরাং, জামায়াতের জন্য অতীতের এই রেকর্ড অনুপ্রেরণামূলক নয়। তবে মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা এবার দলটিকে উজ্জীবিত করেছে। হাসিনা শাসনের পতন, তার ভারত নির্বাসন এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর পরে আসা নিষেধাজ্ঞা, জামায়াতকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার বড় স্বপ্ন অনুসরণ করার উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়।

 

গত বছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিশাল জয়—ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগরসহ অন্যান্য ক্যাম্পাসে—জামায়াতে ইসলামীর এ মনোবল আরও অনেক বৃদ্ধি করেছে। দলটি ছাত্রশিবিরের এই জয়কে যুব সমাজের—১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী যারা মোট ভোটারের ৪০%-এর বেশি—ম্যান্ডেট হিসেবে উপস্থাপন করছে।

 

এসব নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের ভূমিধস জয়ের বিপরীতে জাতীয়বাদী ছাত্রদলের বিশাল পরাজয়—বিএনপির যুবসমর্থকদের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে। যদিও দলের সিনিয়র নেতারা একাধিকবার দাবি করেছেন যে, ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ফলাফল সংসদীয় নির্বাচনের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।

 

এবারের ভোটে অনেক কিছুই নির্ভর করবে প্রাক্তন আওয়ামী লীগের ভোটারদের ওপর। যদি তারা কৌশলগতভাবে ভোট দেয়, তাহলে সমীকরণ পালটে যেতে পারে। অবশ্য উভয় শিবিরই তাদের আকর্ষণে যথেষ্ঠ উদ্যোগী দেখিয়েছে।

 

জোটের লড়াই

বিএনপি ও জামায়াত ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির হঠাৎ উঠে আসার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে, কারণ বেশিরভাগ ছোট দলই নিজেরাই বিএনপির বা জামায়াতের শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে, নির্বাচনে জয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য নিয়ে।

 

এমনকী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখভাগে থাকা কিছু ছাত্রনেতার নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় নাগরিক সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) – নিজস্ব রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো নিয়ে স্বাধীনভাবে দাঁড়াতে পারেনি। নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের "চেতনাকে" বহন করতে পারেনি। নিজদেরই ঘোষিত লক্ষ্য ও ভিশনকে ত্যাগ করে তারা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বেঁধেছে এবং জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের অধীনে নির্বাচন করছে। জামায়াত এনসিপিকে কেবল ৩০টি আসন ছাড় দিয়েছে, যেখানে তারা প্রার্থী দিয়েছে জোটের সমর্থনে।

 

অতএব, দিনে শেষে কোনো "ডার্ক হর্স" জন্ম নেবে না, যা বিএনপি বা জামায়াতকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে। যদি জাতীয় পার্টি উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগে তাদের ঐতিহ্যবাহী শক্তিকেন্দ্রে কিছু আসনে জিততে পারে, তবে নিশ্চিতভাবেই তাকে এনসিপির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে তৃতীয় স্থানের জন্য। আর সেটা এমন একটি স্থান যা আগের চারটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনে সবসময় জামায়াতের ছিল।

 

অর্থনীতির রায়

ব্যক্তিকেন্দ্রিক লড়াইয়ের বাইরে এবারের নির্বাচনে রয়েছে দেশের অর্থনৈতিক সংকটের চাপ। বাংলাদেশ বর্তমানে স্থবির বিনিয়োগ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়তে থাকা দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের ঘাটতি, এবং খেলাপি ঋণের বোঝা টানা ব্যাংকখাতে বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি। কাঠামোগত চাপের কারণে প্রবৃদ্ধিও ধীরগতি হয়েছে।

 

ব্যবসায়ী নেতারা ও অর্থনীতিবিদরা একটি বিষয়ে একমত যে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য শাসনব্যবস্থার রাজনৈতিক বৈধতা অপরিহার্য। বিনিয়োগ নির্ভর করবে শুধু সরকারের পরিবর্তনের ওপর নয়, বরং নির্বাচনি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা থেকেও।

 

একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনই দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে। আর যদি নির্বাচন বিতর্কিত হয়, তা অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত করতে পারে।

 

অর্থাৎ, প্রশ্নটি শুধু কে সিংহাসনে বসবেন তা নিয়েই নয়। বরং তার থেকেও বড় প্রশ্ন হচ্ছে এই উত্তরণ কি এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে, যা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতা সামলে অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবে?

 

বৃহস্পতিবার ভোটাররা দুই রহমানের একজনকে বেছে নেবেন। কিন্তু প্রকৃত পরীক্ষা হবে—গণতান্ত্রিক এই ব্যবস্থাটি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে নিজেই কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে তাকে কেন্দ্র করে।

 

তথ্য সূত্র: টিবিএস


সম্পর্কিত

বাংলাদেশবাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীরবিএনপি

জনপ্রিয়


বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন

আজ দুই ঘণ্টা কিছু গ্রাহকের মোবাইল নেটওয়ার্কে সাময়িক বিঘ্ন হতে পারে, কারণ জানাল অ্যামটব

দেশের বিভিন্ন এলাকায় আজ রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কিছু গ্রাহকের মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হতে পারে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের কারণেই এ ধরনের সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে জানিয়েছে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব)।

বসুন্ধরায় দেড় কোটি টাকায় কেনা ফ্ল্যাটে ‘লুটের’ অভিযোগ প্রবাসী তানিয়া রহমানের

দশ বছর ইংল্যান্ডে প্রবাসজীবন কাটিয়ে স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফেরেন তানিয়া রহমান। লক্ষ্য ছিল রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নিজের ফ্ল্যাটে উঠবেন, নতুন করে শুরু করবেন জীবনের অধ্যায়। কিন্তু সেই স্বপ্নই পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে।

৪৬ কোটির বরাদ্দ, পাঁচ বছরে ব্যয় প্রায় ১৮৮ কোটি- তবু অভিযান চললেও মরছে না মশা

রাজধানীতে মশার উপদ্রব অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। মশা নিধন সিটি করপোরেশনের প্রধান দায়িত্বগুলোর একটি হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে কার্যকারিতা নিয়ে। এমন প্রেক্ষাপটে ওষুধে কাজ হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে কমিটি গঠন করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।

‘মব ভায়োলেন্স’ বন্ধ করতে পারবে নতুন সরকার?

বাংলাদেশে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা দিয়েছেন, “মব কালচারের দিন শেষ।” দাবি আদায়ের নামে দলবদ্ধ সহিংসতা বরদাস্ত করা হবে না বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।