বাংলাদেশ


জাতীয় সংসদে দুই–তৃতীয়াংশ আসনে জয়: কবে কারা পেয়েছিল, তারপর কী হয়েছিল?


সহ-সম্পাদক

শাহারিয়া নয়ন

প্রকাশিত:১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার

আপডেট:১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার

জাতীয় সংসদে দুই–তৃতীয়াংশ আসনে জয়: কবে কারা পেয়েছিল, তারপর কী হয়েছিল?

ছবি: সংগৃহীত


বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে মোট আসন ৩০০টি। কোনো রাজনৈতিক দল এককভাবে ২০০ বা তার বেশি আসন পেলে তাকে দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বলা হয়। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদের দুই–তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে এমন জয় আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের পথও খুলে দেয়।

 

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একাধিকবার দুই–তৃতীয়াংশ বা তার কাছাকাছি আসন পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব জয়ের পরবর্তী সময়েই দেখা গেছে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তন।

 

মুচকি হাসি দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছেন শেখ মুজিবুর রহমান

সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে শাসন কাঠামোই বদলে দিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান


 

১৯৭৩: আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয় ও শাসন কাঠামোর পরিবর্তন

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৯৩টি আসনে জয়লাভ করে। এটি ছিল প্রায় সম্পূর্ণ নিরঙ্কুশ জয়। এর দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে, ১৯৭৫ সালে সংবিধান সংশোধন করে সংসদীয় পদ্ধতি থেকে রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতিতে ফিরে যায় দেশ। পরে সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত ঘোষণা করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) চালু করা হয়। পরবর্তী সামরিক অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্ষমতার পালাবদলের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসে।

 

১৯৭৯: বিএনপির জয় ও পঞ্চম সংশোধনী

১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসনে জয়ী হয়। এই সরকার পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আগের সামরিক শাসনামলে জারি করা অধ্যাদেশগুলোকে বৈধতা দেয় এবং সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে। পরবর্তীতে আদালতের রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করা হয়।

 

১৯৮৬ ও ১৯৮৮: জাতীয় পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা

১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি বিপুল আসন পায় (১৯৮৮ সালে ২৫১টি আসন)। এ সময় সপ্তম ও অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে সামরিক শাসনের বৈধতা দেওয়া হয় এবং ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়।পরবর্তী সময়ে এর কিছু অংশ আদালতের রায়ে বাতিল হয়।

 

১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি): বিএনপির একতরফা জয়, পরে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অধিকাংশ দল বয়কট করায় বিএনপি ২৭৮টি আসনে জয়ী হয়। তবে তীব্র আন্দোলনের মুখে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় এবং চার মাসের মধ্যে পুনর্নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

 

শপথ নেয়ার পর কাগজে সই করছেন খালেদা জিয়া

ছবির ক্যাপশান,২০০১ সালের নির্বাচনে ১৯৩টি আসনে জয়ী হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল - বিএনপি


 

২০০১: চারদলীয় জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসনে জয়ী হয়। জামায়াতে ইসলামিসহ চারদলীয় জোট মিলে ২১৬টি আসন নিয়ে সরকার গঠন করে। ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগ নিয়ে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয়, যা রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়। পরবর্তী সময়ে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে।

 

ফুলের তোড়া দিয়ে নৌকা বানিয়ে শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে

ছবির ক্যাপশান,২০০৮ সালের নির্বাচনে ২৩০টি আসনে এককভাবে জয় পায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার


 

২০০৮: আওয়ামী লীগের ভূমিধস জয়

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৩০টি আসনে জয়ী হয়; জোটসহ মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬২। এই সরকার আদালতের রায়ের প্রেক্ষিতে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত আইন পাস হয়, যেমন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ইত্যাদি। সংসদে কার্যত শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকায় এসব আইন সহজেই পাস হয়।

 

২০১৮ ও ২০২৪: আওয়ামী লীগের একতরফা সংখ্যাগরিষ্ঠতা

২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৫৭টি আসন পায়। তবে এসব নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ছিল। ২০১৮ সালের ভোট ‘রাতের ভোট’ হিসেবে সমালোচিত হয়।

 

হাত তুলে সংবর্ধনা নিচ্ছেন তারেক রহমান
এবার দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি

 

২০২৬: বিএনপির দুই–তৃতীয়াংশ জয়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুই–তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে সরকার গঠনের পথে। এই জয় সংবিধান সংশোধনের সাংবিধানিক সক্ষমতা তৈরি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেক সময় সংসদকে প্রাণবন্ত বিতর্কের ক্ষেত্রের বদলে একচেটিয়া আধিপত্যের জায়গায় পরিণত করেছে। ফলে সংবিধান সংশোধনসহ বড় সিদ্ধান্তগুলো সহজে পাস হয়েছে।

 

সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও ‘কর্তৃত্ববাদী’ ঝুঁকি

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দুই–তৃতীয়াংশ আসন পেলে সরকার ‘ইচ্ছেমতো’ সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা পায়। এতে কখনও কখনও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দেখায়, বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রায়ই সাংবিধানিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের পথ খুলেছে কখনও তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তন, কখনও বিলোপ; কখনও রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা, কখনও শাসনব্যবস্থা বদল।

 

সামনে কী?

অতীতের অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত দেয় দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেমন স্থিতিশীলতা আনতে পারে, তেমনি ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্টের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, নতুন সরকার অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা কীভাবে ব্যবহার করা হয় সংস্কারের জন্য, না কি একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য।

 

তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা


সম্পর্কিত

বাংলাদেশসংসদজাতীয় সংসদ

জনপ্রিয়


বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন

আজ দুই ঘণ্টা কিছু গ্রাহকের মোবাইল নেটওয়ার্কে সাময়িক বিঘ্ন হতে পারে, কারণ জানাল অ্যামটব

দেশের বিভিন্ন এলাকায় আজ রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কিছু গ্রাহকের মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হতে পারে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের কারণেই এ ধরনের সাময়িক বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে জানিয়েছে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব)।

বসুন্ধরায় দেড় কোটি টাকায় কেনা ফ্ল্যাটে ‘লুটের’ অভিযোগ প্রবাসী তানিয়া রহমানের

দশ বছর ইংল্যান্ডে প্রবাসজীবন কাটিয়ে স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফেরেন তানিয়া রহমান। লক্ষ্য ছিল রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় নিজের ফ্ল্যাটে উঠবেন, নতুন করে শুরু করবেন জীবনের অধ্যায়। কিন্তু সেই স্বপ্নই পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে।

৪৬ কোটির বরাদ্দ, পাঁচ বছরে ব্যয় প্রায় ১৮৮ কোটি- তবু অভিযান চললেও মরছে না মশা

রাজধানীতে মশার উপদ্রব অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। মশা নিধন সিটি করপোরেশনের প্রধান দায়িত্বগুলোর একটি হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে কার্যকারিতা নিয়ে। এমন প্রেক্ষাপটে ওষুধে কাজ হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে কমিটি গঠন করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।

‘মব ভায়োলেন্স’ বন্ধ করতে পারবে নতুন সরকার?

বাংলাদেশে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ দায়িত্ব নিয়েই ঘোষণা দিয়েছেন, “মব কালচারের দিন শেষ।” দাবি আদায়ের নামে দলবদ্ধ সহিংসতা বরদাস্ত করা হবে না বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।