বাংলাদেশ
গণতান্ত্রিক পুনরারম্ভ নাকি নতুন বাস্তবতা?
.jpg)
ছবি: টিবিএস
বাংলাদেশের রুগ্ন অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত আঠারো মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিক্ষিপ্ত মব সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির ফলে ব্যবসায়িক আস্থা, বিনিয়োগ প্রবাহ ও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের ফলাফল ছিল স্পষ্ট ও জোরালো। গভীর অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলার প্রেক্ষাপটে ভোটাররা পরিবর্তনের পক্ষেই রায় দিয়েছেন। এই ফলাফল স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
ফলাফল প্রকাশ শুরু হওয়ার পর ব্যবসায়ী মহলসহ দেশের বড় একটি অংশ স্বস্তি প্রকাশ করে। তাদের প্রত্যাশা, নতুন সরকার দ্রুত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন করবে।
এই দ্ব্যর্থহীন রায় আবারও একটি আলোচিত ধারণাকে সামনে এনেছে বাংলাদেশের মানুষ ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সচেতন সিদ্ধান্ত নেন। অনেকের মতে, এই ফলাফল দীর্ঘদিন সংকুচিত থাকা রাজনৈতিক পছন্দ ও ভোটাধিকারের পুনরুদ্ধারের প্রতীক। ২০১৪ সাল থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত টানা তিনটি নির্বাচনে প্রতিযোগিতার ঘাটতি নিয়ে সমালোচনা ছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভোটাররা দীর্ঘ সময় পর প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের সুযোগ পান এবং দৃঢ়ভাবে নিজেদের মত প্রকাশ করেন।
ইতিহাসও সাক্ষ্য দেয় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১, ১৯৯৬ (জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছে। প্রয়োজনে রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা ভোটারদের রয়েছে এবারের ফলাফলও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।
নির্বাচনি লড়াইয়ের কেন্দ্রে ছিল তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি ও শফিকুর রহমানের নেতৃত্বাধীন জামায়াতে ইসলামী। ভোটাররা সূক্ষ্ম কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। বাংলাদেশ ধর্মপ্রাণ সমাজ হলেও কট্টর ধর্মভিত্তিক শাসনের প্রতি ব্যাপক সমর্থন নেই এটি ফলাফলে স্পষ্ট হয়েছে।
বিএনপি নিজেকে তুলনামূলক মধ্যপন্থী ও বহুত্ববাদী শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফল করলেও ক্ষমতায় যেতে পারেনি। ঐতিহাসিক বিতর্ক ও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে রক্ষণশীল অবস্থান সাধারণ ভোটারের একাংশকে দূরে রেখেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
তবে জামায়াতের উত্থানও উপেক্ষণীয় নয়। তারা এখন সংসদে শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে, যা সংসদের সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
মোট ভোটারের অর্ধেকের বেশি নারী। নির্বাচনের ফলাফলেও তাদের প্রভাব স্পষ্ট। নারীর নেতৃত্ব ও জনজীবনে অংশগ্রহণ নিয়ে নেতিবাচক প্রচার বুমেরাং হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নারী ও পুরুষ উভয় ভোটারই সেকেলে বয়ান প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বিএনপি প্রচারণায় নারী অংশগ্রহণকে সামনে এনেছে। ভবিষ্যৎমুখী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে দলটি সচেষ্ট ছিল। তারুণ্যনির্ভর আধুনিক প্রচারকৌশল, স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলার বার্তা সাধারণ মানুষের মধ্যে সাড়া ফেলেছে।
নির্বাচনটি ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক তারেক রহমান বনাম শফিকুর রহমান। দুজনেই প্রথমবারের মতো সংসদে প্রবেশ করছেন। একজন সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, অন্যজন বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে থাকবেন।
লন্ডনে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফেরা তারেক রহমান দলের তৃণমূলকে উজ্জীবিত করেছে। নিরঙ্কুশ বিজয় তার নেতৃত্বকে সুসংহত করেছে। তবে সামনে বড় প্রশ্ন—তিনি কি রাজনৈতিক বিজয়ী থেকে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হতে পারবেন?
জুলাইয়ের আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য পায়নি। তৃতীয় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।
অন্যদিকে জাতীয় পার্টি কার্যত প্রান্তিক হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ থাকার প্রভাব তাদের গ্রহণযোগ্যতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেমন সংস্কারের সুযোগ তৈরি করে, তেমনি ঝুঁকিও বহন করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কখনও কখনও ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ও বিরোধী মত দমনের দিকে নিয়ে গেছে।
শক্তিশালী জনসমর্থন সংস্কার সহজ করতে পারে, তবে সংযমহীন প্রয়োগে প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সংসদীয় কার্যপ্রণালি, ভিন্নমত ও শাসন সংস্কারে নতুন সরকারের ভূমিকা তাই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষিত হবে।
উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে এ নিয়েও আলোচনা চলছে।
বহু বছরের সীমিত প্রতিযোগিতার পর এবারের নির্বাচনকে অনেকে গণতান্ত্রিক পুনরারম্ভ হিসেবে দেখছেন। প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি নতুন গতি পেয়েছে এবং একটি স্পষ্ট ম্যান্ডেট তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে শক্তিশালী বিরোধী পক্ষও গড়ে উঠেছে।
এখন প্রশ্ন এই মুহূর্ত কি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্ত ভিত্তি দেবে, নাকি সংখ্যাগুরু আধিপত্যের নতুন অধ্যায় শুরু করবে? ভোটাররা তাদের রায় দিয়েছেন। এখন দায়িত্ব তাদের, যাদের হাতে সেই আস্থার ভার ন্যস্ত হয়েছে।
তথ্য সূত্র: টিবিএস
জনপ্রিয়
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
হামে শিশুমৃত্যু ৫১২, একদিনে মারা গেছে আরও ১৩ শিশু
দেশে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১২ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ১৩২ শিশু। শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

পল্লবীতে শিশু হত্যা: সামাজিক মাধ্যমে কেন আলোচনায় ‘দ্য ডিসাপেয়ারেন্স অব উইলি বিংহাম’?
রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছর বয়সি শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। এই নৃশংসতার পরিপ্রেক্ষিতে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি যখন তুঙ্গে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ২০১৫ সালের বহুল আলোচিত অস্ট্রেলিয়ান স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিসাপেয়ারেন্স অব উইলি বিংহাম’ (The Disappearance of Willie Bingham)। মাত্র ১২ মিনিটের এই মনস্তাত্ত্বিক সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন ম্যাথু রিচার্ড।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাল জামায়াতে ইসলামী
ধর্ষকের প্রকাশ্য শাস্তি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। শুক্রবার দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে এ প্রতিক্রিয়া জানান।

রাত বাড়লেই সুনামগঞ্জ শহরে চুরির আতঙ্ক, অতিষ্ঠ বাসিন্দারা
সুনামগঞ্জ শহরে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলেছে চুরির ঘটনা। বাসাবাড়ির পাশাপাশি সরকারি, আধাসরকারি ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানেও হানা দিচ্ছে চোরচক্র। চিহ্নিত চিচকে চোরদের দৌরাত্ম্যে শহরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়ছে।









