খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ২১ ফেব্রুয়ারির সকাল শুরু হয় নীরব শ্রদ্ধায়। শহীদ মিনারের পাদদেশ পুষ্পস্তবকে ভরে ওঠে, শিক্ষার্থীদের সাদা-কালো পোশাক আর কালো ব্যাজে ফুটে ওঠে শোকের প্রতীক। ভাষা শহীদদের স্মরণে ধ্বনিত হয় প্রতিজ্ঞা।
কিন্তু দিন পেরোতেই ক্যাম্পাস ফিরে যায় নিয়মিত একাডেমিক ছন্দে—শ্রেণিকক্ষে ইংরেজি প্রেজেন্টেশন, সেমিনারে ইংরেজি গবেষণাপত্র, আনুষ্ঠানিক আলোচনায় ইংরেজির প্রাধান্য। অন্যদিকে আড্ডা, নাটক, বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক চর্চায় বাংলা থাকে স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাণবন্ত।
এই দ্বৈত বাস্তবতা থেকেই প্রশ্ন উঠছে—মাতৃভাষা কি কেবল স্মরণের বিষয়, নাকি তা উচ্চশিক্ষার কার্যকর মাধ্যম?
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারের আত্মত্যাগ রাষ্ট্রভাষার দাবিকে জাতীয় চেতনার ভিত্তিতে রূপ দেয়। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আসে ১৯৯৯ সালে, যখন ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
এই স্বীকৃতি ভাষাগত বৈচিত্র্য ও মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্বকে বৈশ্বিক পরিসরে প্রতিষ্ঠা করে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—উচ্চশিক্ষায় সেই স্বীকৃতির প্রতিফলন কতটা?
ক্যাম্পাসের ভাষা-বাস্তবতা
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায়, একাডেমিক পরিসরে ইংরেজির প্রাধান্য সুস্পষ্ট। অধিকাংশ প্রেজেন্টেশন, গবেষণাপত্র ও কনফারেন্স ইংরেজিতে অনুষ্ঠিত হয়।
আইন ডিসিপ্লিনের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল তাসনিম বলেন, আমরা বাংলায় ভাবি, কিন্তু একাডেমিক লেখায় উপযুক্ত পরিভাষা না পাওয়ায় ইংরেজির দিকে ঝুঁকতে হয়।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিনের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাতুল খান বলেন, ইংরেজিতে উপস্থাপন না করলে অনেক সময় গুরুত্ব কমে যায়। এতে মনে হয় বাংলার জ্ঞানচর্চার মূল্য কমছে।
অনানুষ্ঠানিক জরিপের চিত্র
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের ৫০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পরিচালিত একটি অনানুষ্ঠানিক মতামত-জরিপে দেখা যায়— ৬৮% শিক্ষার্থী মনে করেন, একাডেমিক উপস্থাপনায় ইংরেজি প্রায় বাধ্যতামূলক। ৫৬% জানান, বাংলায় গবেষণাধর্মী লেখা প্রস্তুতে পরিভাষাগত সমস্যা হয়। ৬৪% বিভাগীয় সেমিনারের কিছু অংশ বাংলায় হওয়া উচিত বলে মত দেন। তবে ৮১% শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও পেশাগত দক্ষতার জন্য ইংরেজির গুরুত্ব স্বীকার করেন।
জরিপটি সীমিত পরিসরের এবং পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব দাবি করে না। তবে এটি ভাষা-ব্যবহারে ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
ভাষা, জ্ঞান ও ক্ষমতা
ভাষাবিদ তারিক রহমান ভাষাকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তির বাহক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, যে ভাষায় জ্ঞান উৎপাদন হয়, সেই ভাষাই ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
কেনিয়ার লেখক Ngũgĩ wa Thiong'o তাঁর Decolonising the Mind গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ভাষা মানুষের চিন্তার কাঠামো নির্মাণে গভীর প্রভাব ফেলে। মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চা ব্যক্তি ও সমাজকে নিজস্ব বৌদ্ধিক ভিত্তি দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি জ্ঞান উৎপাদনের প্রধান ভাষা ইংরেজি হয়, তবে বাংলা ধীরে ধীরে আবেগের ভাষায় সীমিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ভারসাম্যের প্রশ্ন
উচ্চশিক্ষায় ইংরেজির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক জার্নাল, বৈশ্বিক গবেষণা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ইংরেজি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বাংলা ভাষায় মানসম্মত পাঠ্যসামগ্রী ও পরিভাষা উন্নয়নের কাজও প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ই নতুন জ্ঞান ও ভাষার বিকাশের ক্ষেত্র। ব্যবহার বাড়লেই ভাষার বৌদ্ধিক পরিসর প্রসারিত হয়।
মাতৃভাষা দিবস ইতিহাসকে স্মরণ করায়, কিন্তু প্রতিদিনের ভাষাচর্চাই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। ফুলের স্তবক একদিন শুকিয়ে যায়; ব্যবহৃত ভাষাই টিকে থাকে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে তাই মূল প্রশ্ন—মাতৃভাষা কি কেবল আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধার বিষয় হয়ে থাকবে, নাকি জ্ঞান উৎপাদনের সক্রিয় মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে?


.jpg)


.webp)

.jpg)

.jpg)
.jpg)
.jpg)

