বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে যখন সারাদেশে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে, তখন সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল-এ ভিন্ন চিত্র। এখানে নেই কোনো উৎসবের ছোঁয়া; বরং পাকা ধান ঘরে তোলা, জলাবদ্ধতা ও আগাম বৃষ্টির শঙ্কা নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা।
হাওরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সোনালি পাকা ধানে ভরে উঠেছে বিস্তীর্ণ জমি। কৃষকের পাশাপাশি কৃষানিরাও ধান শুকানো, খলা প্রস্তুত ও ফসল ঘরে তোলার কাজে ব্যস্ত। কোথাও কোথাও ধান কাটা শুরু হলেও জলাবদ্ধতা ও আবহাওয়াজনিত অনিশ্চয়তায় পুরোপুরি গতি পায়নি এ কার্যক্রম।
কৃষকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ আগাম বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের পানি। হাওরে জমে থাকা পানি এবং অস্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধের কার্যকারিতা নিয়েও দেখা দিয়েছে শঙ্কা। অনেক স্থানে অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে বৃষ্টির পানি আটকে গিয়ে তলিয়ে গেছে ফসল। ফলে কৃষকরা নিজেরাই বাঁধ কেটে পানি সরানোর চেষ্টা করছেন, যা কোথাও কোথাও প্রশাসনের সঙ্গে বিরোধ ও সংঘর্ষের জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতি মধ্যনগর উপজেলায় বাঁধ কাটতে গিয়ে মাটি চাপায় এক তরুণ কৃষকের মৃত্যু হয়েছে, যা পুরো এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই হাওরে শুরু হয়েছে বৈশাখ।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এবার জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। তবে আগাম বৃষ্টিতে ইতোমধ্যে ৩ হাজার ১৮৯ হেক্টর জমির ধান জলাবদ্ধতায় তলিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে মোট ১ হাজার ৩৩১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, শাল্লা, মধ্যনগর ও ধর্মপাশা উপজেলার নিচু জমিতে এখনো হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। এতে ধান কাটার কাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল করিম বলেন, এবার ধান ভালো হয়েছে, কিন্তু বৃষ্টির কারণে অনেক জমিতে পানি জমে আছে। পানি না নামলে ধান কাটা সম্ভব না। আবার বৃষ্টি হলে বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
একই এলাকার কৃষক মো. রফিক মিয়া জানান, শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটতে খরচ বেড়ে গেছে। ১৩০০ থেকে ১৫০০ টাকার নিচে কোনো শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। পানির মধ্যে কাজ করতে চায় না অনেকেই, বলেন তিনি।
এদিকে, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, এ বছর ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০৩ কিলোমিটার অস্থায়ী ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রতিটি উপজেলায় কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা প্রয়োজনে বাঁধ কেটে পানি অপসারণের ব্যবস্থা নেবে।
তবে মাঠপর্যায়ে অনেক কৃষকই বাঁধের মান ও পরিকল্পনা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণেই পানি স্বাভাবিকভাবে বের হতে পারছে না, ফলে ফসল ডুবে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন-এর সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণে হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে এবারের বৈশাখে কৃষকদের জীবনে আনন্দের পরিবর্তে উদ্বেগই বেশি।
অন্যদিকে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ধান কাটা ধীরে ধীরে বাড়বে এবং আগামী সপ্তাহে পুরোদমে শুরু হবে। অনুকূল আবহাওয়া থাকলে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ধান ঘরে তোলা শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এখন উৎসব নয়, চলছে সময়ের সঙ্গে লড়াই। সোনালি ধান ঘরে তোলার আগ পর্যন্ত স্বস্তি ফিরছে না কৃষকদের জীবনে।