বিনোদন
‘না’ গণভোট যেভাবে একটি দেশের ইতিহাস বদলে গিয়েছিল
.jpg)
‘নো’ চিলির গণভোট নিয়ে। অর্থাৎ দিতে হবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট । ছবি: কোলাজ
আপনি যদি চিলির বিখ্যাত সিনেমা ‘নো’ এখনো না দেখে থাকেন, তবে আপনার দেখা উচিত। মূলত এটি চিলির গণভোট নিয়ে। অর্থাৎ দিতে হবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট। এই গণভোটের ওপর নির্ভর করছিল দেশটি কোন দিকে যাবে। বলা যায়, এই গণভোটই বদলে দিয়েছিল পুরো একটি দেশকে। এ নিয়ে আলোচনার আগে চিলির কিছু ঘটনা জানা দরকার। সেটা বলার আগে আরেকটি সিনেমার কথা বলা যাক।
আরেক সিনেমার গল্প
‘মিসিং’ সিনেমাটি আমি প্রথম দেখি আশির দশকে। তখন ভিসিআর-ভিসিপির যুগ। মহাখালীর রোজভ্যালি থেকে ভিডিও ক্যাসেট ভাড়া নিতে হতো। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। ‘মিসিং’ সিনেমা থেকেই আমার রাজনীতি ও সত্যি ঘটনানির্ভর সিনেমা আমার পছন্দের তালিকায় স্থায়ীভাবে ঢুকে পড়ে, যা আজও আছে।
১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। ক্যু হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলিতে। চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দেকে সরিয়ে জেনারেল অগাস্তো পিনোশে ক্ষমতা দখল করেন। এই দিনেই মার্কিন সাংবাদিক চার্লস হরমান ফিরছিলেন চিলিতে। পথে তিনি হয়তো দেখেছিলেন গোপন কিছু। তাই আর বাসায় ফিরতে পারেননি। চিলিতেই থাকতেন স্ত্রী বেথ হরমান (সিসি স্পাসেক)। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ছেলের খোঁজে এলেন বাবা এডমন্ড হরমান (জ্যাক লেমন)।
১৯৮২ সালে মুক্তি পাওয়া গ্রিক পরিচালক কোস্তা গাবরাসের মিসিংয়ের গল্পটা এ রকমই। আসলেই কি এই ক্যুর পেছনে কেন্দ্রীয় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) জড়িত ছিল?

পরিচালক সেটাই খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন সিনেমাজুড়ে। ১৯৭০-৮০ দশকের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক চলচ্চিত্রগুলোর একটি এই ‘মিসিং’। কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ছবির স্বর্ণপাম পেয়েছিল এটি। সে সময়ের চিলির মার্কিন রাষ্ট্রদূত নাথানিয়েল ডেভিস কোস্তা গাবরাসের বিরুদ্ধে ১৫০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ মামলাও করেছিলেন। যদিও আদালত মামলাটি খারিজ করে দিয়েছিলেন।
পিনোশের ক্ষমতা দখল
‘নো’ সিনেমার গল্পটি এই পিনোশেকে নিয়েই। ১৯৬০-এর দশকে চিলি তাদের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করত। ১৯৭০ সালে বামপন্থী জোটের প্রার্থী সালভাদর আয়েন্দে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। আয়েন্দে সরকার দেশের সম্পদ পুনর্বণ্টনের চেষ্টা করেছিলেন, যা শুরুতে অর্থনীতিতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি আনলেও শিগগিরই মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বিরোধিতার কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
১৯৭২ সালের মধ্যে দেশজুড়ে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিলেও ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে তাঁর জোটই জয়ী হয়। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনী এক পরিকল্পিত অভ্যুত্থান ঘটায়। এর নেতৃত্বে ছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল অগাস্তো পিনোশে। আয়েন্দে আত্মসমর্পণ না করে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদেই আত্মহত্যা করেন।
অভ্যুত্থানের পর সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। দেশটির জাতীয় পুলিশ হাজার হাজার আয়েন্দে সমর্থককে ধরে হত্যা করে। এটিকে লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে রক্তাক্ত সামরিক অভ্যুত্থানের একটি হিসাবে বলা হয়। ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজার মানুষ নিহত হয় এবং আরও অনেকে দেশ ছেড়ে পালায়।
এটি চিলির গণভোট নিয়ে। অর্থাৎ দিতে হবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট। এই গণভোটের ওপর নির্ভর করছিল দেশটি কোন দিকে যাবে। বলা যায়, এই গণভোটই বদলে দিয়েছিল পুরো একটি দেশকে।
সেনা অভ্যুত্থানের পর যা হয়, ঠিক সেটাই হয় চিলিতে। অর্থাৎ সেনা নেতৃত্ব প্রথমে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই তারা সাময়িকভাবে ক্ষমতায় থাকবে।
কিন্তু সেনাপ্রধান জেনারেল অগাস্তো পিনোশে ধীরে ধীরে নিজের হাতে পুরো ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেন। তিনি বিরোধীদের দমন করতে ডিনা (ডিআইএনএ-দিরেকসিওন নাসিওনাল দে ইন্তেলিহেনসিয়া) নামে একটি গোয়েন্দা সংস্থা গঠন করেন। ১৯৭৫-৭৬ সালে এই সংস্থার অভিযানে কয়েক শ মানুষ নিখোঁজ হয়।
১৯৭৪ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পিনোশে অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করা একদল অর্থনীতিবিদকে একত্র করেন, তাঁদের বলা হয় ‘শিকাগো বয়েজ’। তাঁরা বাজারমুখী অর্থনীতির নীতি প্রণয়ন করেন। এতে কিছু মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি হলেও অধিকাংশ চিলিয়ান মজুরি কমে যাওয়ায় কষ্টে দিন কাটাতে থাকে। পরে অবশ্য সামগ্রিকভাবেই অর্থনীতি খারাপ হয়ে যায়।
সিনেমার গল্পটি এই পিনোশেকে নিয়েই। ১৯৬০-এর দশকে চিলি তাদের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করত।
যুক্তরাষ্ট্রে একটি হত্যাকাণ্ড
ক্ষমতা দখলে মার্কিন সমর্থন থাকলেও পরে পিনোশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে এক হত্যাকাণ্ডের কারণে। ১৯৭৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটন ডিসির শেরিডান সার্কেল এলাকায় একটি গাড়িতে বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন অরল্যান্ডো লেটেলিয়ের ও তাঁর মার্কিন সহকারী রনি কার্পেন মফিট। লেটেলিয়ের ছিলেন চিলির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তিনি সালভাদর আয়েন্দের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। ১৯৭৩ সালে আয়েন্দে সরকার উৎখাত হওয়ার পর লেটেলিয়ের গ্রেপ্তার হন, নির্যাতনের শিকার হন এবং পরে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন।
নির্বাসনে যাওয়ার পর লেটেলিয়ের যুক্তরাষ্ট্রেই বসবাস করতেন। সে সময় তিনি পিনোশে সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন, দমন-পীড়ন ও অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে প্রচার চালাচ্ছিলেন। তিনি ওয়াশিংটনের প্রভাবশালী থিঙ্ক ট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজে (আইপিএস) কাজ করতেন। চিলির সামরিক সরকারের চোখে লেটেলিয়ের ছিলেন একজন শত্রু।
তদন্ত শুরু করে মার্কিন সরকার। তদন্তে বেরিয়ে আসে যে হামলাটি ছিল চিলির সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিনার পরিকল্পিত অপারেশন। হামলার পরিকল্পনা ও নির্দেশ এসেছিল পিনোশে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেই। এর বাস্তবায়নে যুক্ত ছিল কিউবান বংশোদ্ভূত চরম ডানপন্থী কিছু সন্ত্রাসী।

এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র চরম ক্ষুব্ধ হয়, মানবাধিকার সংগঠনগুলোও পিনোশে সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার চালায়। তীব্র সমালোচনা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পিনোশে ১৯৮০ সালে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করেন। এতে বলা হয়, ১৯৮৮ সালে জনগণ গণভোটে সিদ্ধান্ত নেবে তিনি আরেক দফা ক্ষমতায় থাকবেন কি না। কিন্তু তত দিনে অর্থনীতির অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। বেকারের সংখ্যা বাড়ে। শুরু হয় জনবিক্ষোভ। এমনকি ধনীদের এলাকাতেও নারীরা খালি হাঁড়ি বাজিয়ে প্রতিবাদ জানায়। রাজনৈতিক দলগুলো গোপনে সংগঠিত হতে শুরু করে। পিনোশেও টিকে থাকতে আবারও সেনা টহল, কারফিউ, হত্যাযজ্ঞ চালান। ১৯৮৬ সালে জরুরি অবস্থা জারি করেন।
চিলির সেই বিখ্যাত গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৮ সালের ৫ অক্টোবর। এটি ছিল দেশটির সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে ফেরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। গণভোটে ভোটারদের সামনে দুটি বিকল্প ছিল- ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’। ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে জেনারেল অগাস্তো পিনোশে আরও আট বছর ক্ষমতায় থাকবেন। আর ‘না’ ভোটের অর্থ ছিল ১৯৮৯ সালেই সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করা হবে।
চিলির সেই বিখ্যাত গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৮ সালের ৫ অক্টোবর। এটি ছিল দেশটির সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে ফেরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। গণভোটে ভোটারদের সামনে দুটি বিকল্প ছিল—‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’।
এবার ‘নো’ সিনেমার গল্প
‘নো’ হচ্ছে চিলির ১৯৮৮ সালের গণভোটকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র। ছবিটি মুক্তি পায় ২০১২ সালে। সিনেমার কাহিনি এক তরুণ বিজ্ঞাপনকর্মীকে ঘিরে। যার ওপর দায়িত্ব ছিল অগাস্তো পিনোশের বিরুদ্ধে গণভোটে ‘না’ ভোট নিয়ে প্রচারণা বা বিজ্ঞাপন তৈরি করা। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সরকার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে মাত্র ১৫ মিনিট প্রচারণার সুযোগ দিয়েছিল। টিভি প্রচারণায় কীভাবে মানুষকে প্রভাবিত করা হয়, সেটাই ছবির মূল বিষয়। সিনেমাটি শ্রেষ্ঠ বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার মনোনয়ন পেয়েছিল।
সিনেমার গল্পটা এ রকম—রেনে সাভেদ্রা একজন সফল বিজ্ঞাপন নির্মাতা। তাঁকে গণভোটে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানো দলের পক্ষ থেকে কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তাঁর রক্ষণশীল বস এতে খুশি না হলেও রেনে রাজি হন। কাজ শুরু করে তিনি দেখেন, ‘না’ পক্ষের বিজ্ঞাপনগুলো শুধু পিনোশের সময়ের নির্যাতন আর দমন-পীড়নের ভয়ংকর ছবি তুলে ধরা হয়েছে। রেনে সাভেদ্রা মনে করলেন, এ রকম বিজ্ঞাপন মানুষের মনে ভয় জাগায়, আশার আলো দেখায় না।
‘নো’ হচ্ছে চিলির ১৯৮৮ সালের গণভোটকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র। ছবিটি মুক্তি পায় ২০১২ সালে। সিনেমার কাহিনি এক তরুণ বিজ্ঞাপনকর্মীকে ঘিরে।

রেনে প্রস্তাব দেন, ভয় নয়, বরং আনন্দ, আশা আর সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রচারণা চালাতে হবে। শুরুতে দলের অনেকে আপত্তি করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর পরিকল্পনাই গ্রহণ করা হয়। টানা ২৭ রাত টেলিভিশনে দুই পক্ষ তাদের বিজ্ঞাপন প্রচার করে। ‘না’ পক্ষের বিজ্ঞাপনগুলো ছিল সৃজনশীল, প্রাণবন্ত ও সাধারণ মানুষের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য। অতীতের কিছু দেখানো হয়নি, বরং ‘না’ ভোট দিলে যে সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ পাওয়া যাবে—সেই স্বপ্ন দেখিয়েছে। অন্যদিকে ‘হ্যাঁ’ পক্ষের প্রচার ছিল একঘেয়ে ও কড়া ভাষার, যা তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। বিজ্ঞাপন ছাড়াও বড় সমাবেশ, কনসার্ট ও আন্তর্জাতিক তারকাদের সমর্থন দেওয়া ভিডিও ‘না’ প্রচারণাকে আরও জোরালো করে তোলে। ‘হ্যাঁ’ পক্ষ তখন বাধ্য হয়ে তাদের বিজ্ঞাপনের ধরন নকল করতে শুরু করে। বার্তাটি হচ্ছে, নির্বাচনী প্রচারণায় অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে ভোট পাওয়া যায় না, বরং ভোট দিলে কী লাভ হবে, সেটা প্রচার করাটাই মুখ্য।
সিনেমায় প্রায় ৩০ শতাংশ প্রকৃত আর্কাইভ ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে, যার মধ্যে নিউজ ব্রডকাস্ট এবং আসল বিজ্ঞাপনগুলো রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কী হয়, তার জন্য সিনেমাটা দেখতে হবে। আর যাঁরা চিলির ইতিহাস জানেন, তাঁদের তো নতুন করে কিছু বলার নেই।
সিনেমার পেছনের গল্প
সিনেমার প্রধান চরিত্র রেনে সাভেদ্রা কিন্তু বাস্তবে ছিলেন না। তবে সে সময়ের অনেক ঘটনাই তুলে আনা হয়েছে। কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক। এই অংশে স্পয়লার আছে।
গোপন নথিতে যা আছে: জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ন্যাশনাল সিকিউরিটি আর্কাইভে সংরক্ষিত ও পরে ডিক্লাসিফাইড মার্কিন সরকারি নথি থেকে জানা যায়, ১৯৮৮ সালের গণভোটের আগে চিলির পিনোশে সরকার পরাজয়ের সম্ভাবনা ধরে তিন ধাপের জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করেছিল। মার্কিন দূতাবাস, সিআইএ ও মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার (ডিআইএ) কাছে নিয়মিত এসব তথ্য পৌঁছাচ্ছিল।
পরিকল্পনাগুলো ছিল, জিতলে স্বাভাবিকভাবে ফল মেনে নেওয়া, অল্প ব্যবধানে হারলে ফল জাল করা, আর বড় ব্যবধানে হারলে সহিংসতা উসকে দিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করে পুরো প্রক্রিয়াই ভেস্তে দেওয়া।
গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়, সরকারপন্থী কট্টর গোষ্ঠীগুলোকে দিয়ে দাঙ্গা বাধানোর প্রস্তুতি ছিল। উদ্দেশ্য, অরাজকতা তৈরি করে তার দায় বিরোধীদের ওপর চাপানো। এরপর নিরাপত্তা বাহিনী নামিয়ে ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করে ভোট স্থগিত বা বাতিল করা।
রিগ্যান প্রশাসন তখন বুঝতে পারছিল, পিনোশের স্বৈরাচারী শাসন চিলিতে রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে, বামপন্থীদের আরও উগ্র করছে এবং মধ্যপন্থীদের দুর্বল করছে। তাই মার্কিন কূটনীতিক ও সামরিক প্রতিনিধিদের নির্দেশ দেওয়া হয় চিলির ক্ষমতাকেন্দ্রের লোকদের স্পষ্ট করে জানাতে যে গণভোট বানচাল করলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং আন্তর্জাতিক সুনাম ধসে পড়বে। ব্রিটিশদের মাধ্যমেও একই বার্তা পৌঁছানো হয়। চিলির প্রভাবশালী মহল এই সংকেত উপেক্ষা করেনি। মনে রাখতে হবে, তত দিনে কমিউনিস্ট জুজুর ভয় অনেকটা কেটে যাচ্ছিল। ফলে পিনোশের প্রয়োজনও ফুরিয়ে এসেছিল।
সিনেমায় প্রায় ৩০ শতাংশ প্রকৃত আর্কাইভ ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে, যার মধ্যে নিউজ ব্রডকাস্ট এবং আসল বিজ্ঞাপনগুলো রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কী হয়, তার জন্য সিনেমাটা দেখতে হবে।

ফলাফল নিয়ে যা ঘটেছিল
১৯৮৮ সালের ৫ অক্টোবর বিপুল অংশগ্রহণে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। নিবন্ধিত ভোটারের প্রায় ৯৭ শতাংশ ভোট দেন। ‘না’ ভোটের প্রচারকেরা ভোটার নিবন্ধনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। এটাই ছিল বিজয়ের আরেকটি বড় কারণ। ভয় কাটিয়ে ভোটাররা ভোট দিতে এসেছিল। সন্ধ্যার দিকে প্রথম আংশিক ফলে ‘হ্যাঁ’ এগিয়ে—এমন ঘোষণা দেওয়া হয়, যা পরে জাল বলে প্রমাণিত হয়। আরও কেন্দ্রের ফল আসতে শুরু করলে কর্তৃপক্ষ ফল প্রকাশ বন্ধ করে দেয়। শেষ পর্যন্ত পূর্ণ গণনায় ‘না’ ১০ শতাংশের বেশি ব্যবধানে জিতে যায়। ভোটের হার ছিল, ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশ বনাম ৪৩ শতাংশ।
একপর্যায়ে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল যে পিনোশে ক্ষুব্ধ ও অস্থির হয়ে জরুরি ক্ষমতা নিজের হাতে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। গভীর রাতে শীর্ষ জেনারেলদের ডেকে পাঠান এবং সেনা নামানোর প্রস্তুতি নেন। কিন্তু সামরিক জান্তার অন্য জেনারেলরা এতে সায় দেননি; বরং একপর্যায়ে বৈঠক থেকে বিমানবাহিনীর প্রধান বের হয়ে সাংবাদিকদের বলেন যে ‘না’ জিতে গেছে। একে একে জেনারেলরা জরুরি আদেশে সই করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে সামরিক দমন অভিযান আর শুরু হয়নি।
১৯৮৮ সালের চিলির গণভোট শুধু একটি ভোট নয়, এটি ছিল কৌশল, সাহস, আন্তর্জাতিক চাপ ও শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত সব মিলিয়ে ইতিহাস বদলে দেওয়ার এক বিরল উদাহরণ।
পিনোশের ভাগ্যে কী ঘটেছিল
১৯৮৮ সালে জাতীয় গণভোটে হেরে যাওয়ার পর পিনোশে ১৯৯০ সালের ১১ মার্চ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীভাবে দায়িত্বে ছিলেন। এ সময়ের মধ্যে ১৯৮৯ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পিনোশের সমর্থকেরা ১৯৮৫-৮৯ সময়ের অর্থমন্ত্রী হারনান বুচিকে প্রার্থী করে। তবে সেই নির্বাচনে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট নেতা পাত্রিসিও আয়লউইন বিজয়ী হন। ১৯৯০ সালের ১১ মার্চ তিনি প্রেসিডেন্ট হন। এভাবে চিলি ধীরে ধীরে পূর্ণ গণতান্ত্রিক শাসনে ফিরে যায়।
১৯৯০ সালে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলে পিনোশে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়েন। তবে তিনি চিলি সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত বহাল ছিলেন। এরপর তিনি ‘আজীবন সিনেটর’ পদ পান, যা তাঁকে আইনি দায় থেকে আংশিক সুরক্ষা দিয়েছিল।

অগাস্তো পিনোশের শেষ জীবন কেটেছে গ্রেপ্তার, বিচারপ্রক্রিয়া, গৃহবন্দিত্ব ও দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মধ্যে। তিনি জীবদ্দশায় কখনো কোনো মামলায় চূড়ান্তভাবে দণ্ডিত হননি, তবে মৃত্যুর আগপর্যন্ত মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন।
১৯৯০ সালে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলে পিনোশে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়েন। তবে তিনি চিলি সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত বহাল ছিলেন। এরপর তিনি ‘আজীবন সিনেটর’ পদ পান, যা তাঁকে আইনি দায় থেকে আংশিক সুরক্ষা দিয়েছিল।
১৯৯৮ সালের ১৬ অক্টোবর চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গেলে ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। স্পেনের এক বিচারকের জারি করা আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে এই গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগের মধ্যে ছিল নির্যাতন, গুম এবং হত্যা। এটি ছিল বিশ্ব ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা, যেখানে একজন সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানকে বিদেশে মানবাধিকার অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০০০ সালের মার্চ মাসে স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে ব্রিটেন তাঁকে চিলিতে ফেরত পাঠায়। দেশে ফেরার পর তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা শুরু হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ‘ক্যারাভান অব ডেথ’ হত্যাকাণ্ড (১৯৭৩ সালে চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর পরিচালিত একটি কুখ্যাত সামরিক অভিযান, যেখানে পিনোশে শাসনের বিশেষ বাহিনী দেশজুড়ে বিভিন্ন শহরে গিয়ে আটক রাজনৈতিক বন্দীদের হত্যা করে), গুম এবং দুর্নীতি। এরপর বিভিন্ন সময়ে তাঁকে গৃহবন্দী করা হয়, আবার স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে মুক্তিও দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের রিগস ব্যাংকে পিনোশের গোপন অ্যাকাউন্টে ২৮ মিলিয়ন ডলার জমা থাকার তথ্য প্রকাশ পায়। এতে কর ফাঁকি ও অবৈধ সম্পদের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু হয়।
২০০৬ সালের ১০ ডিসেম্বর হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে সান্তিয়াগোর একটি সামরিক হাসপাতালে পিনোশে মারা যান। তাঁর বয়স ছিল ৯১ বছর। মৃত্যুর সময়ও তিনি একাধিক মানবাধিকার মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন, কিন্তু কোনো মামলার চূড়ান্ত রায় হয়নি। তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন দেওয়া হয়নি, তবে সামরিক মর্যাদায় শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
পিনোশের একটি বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে, ‘আমি যা করেছি, যা কষ্ট পেয়েছি সবকিছুই আমি ঈশ্বর ও চিলির জন্য করেছি; কারণ, আমি চিলিকে কমিউনিস্ট হতে দিইনি।’
যাঁরা সেই সময়ের চিলি সামরিক ক্যু এবং পরবর্তী ঘটনা জানতে চান, তাঁরা দেখতে পারেন তিন খণ্ডের প্রামাণ্য চিত্র, ‘দ্য ব্যাটল অব চিলি’।
তথ্য সূত্র: প্রথম আলো
জনপ্রিয়
বিনোদন থেকে আরও পড়ুন
ঈদের সিনেমা ঘিরে দর্শক ভিড়: সন্ধ্যার পর শো চালুর দাবি নির্মাতাদের
জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে সন্ধ্যা ৭টার পর দোকান, মার্কেট ও শপিংমল বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে দেশের মাল্টিপ্লেক্স সিনেমা হলগুলোতেও। ফলে রোববার থেকে সন্ধ্যার পর সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ রাখা হচ্ছে। তবে এই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানিয়েছেন ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলোর নির্মাতা ও প্রযোজকেরা।

ফাতিমা সানা শেখ: “অভিনয়ই সব নয়, নিজেকে খুঁজেও পেতে হবে”
বলিউডের গ্ল্যামার ও আলোঝলকানির পেছনে যে এক গভীর আত্মানুসন্ধানের গল্প থাকে, তা আরও একবার মনে করিয়ে দিলেন ফাতিমা সানা শেখ। শিশুশিল্পী হিসেবে চাচি ৪২০ দিয়ে রুপালি পর্দায় হাতেখড়ি, এরপর দঙ্গল-এর মতো ব্লকবাস্টার সিনেমায় কন্যার চরিত্রে খ্যাতি অর্জন—ফাতিমার ক্যারিয়ারের গ্রাফ সত্যিই ঈর্ষণীয়।

লুবাবার বিয়ে নিয়ে বিতর্ক: বাল্যবিবাহ প্রমাণিত হলে কী শাস্তি হতে পারে?
এক সময়ের শিশুশিল্পী সিমরিন লুবাবা-র বিয়ে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। অভিযোগ উঠেছে, মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিয়ে করায় এটি বাল্যবিবাহের আওতায় পড়তে পারে।

ছেলেকে দুঃসংবাদ দেবেন কীভাবে- ভাবতেই ভেঙে পড়েন প্রিয়াঙ্কা সরকার
ওপার বাংলার অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জির আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার পরিবারে। এই কঠিন সময়ে সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছেন তার স্ত্রী ও অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার।


.jpg)






