এক্সক্লুসিভ
হালখাতার সংস্কৃতি ধরে রেখেছে পুরান ঢাকা
নিয়াজ মোর্শেদ:
বাংলা সংস্কৃতিতে পহেলা বৈশাখ ঐতিহ্যবাহী ও আনন্দমুখর দিন। এ দিনে বাংলা বিগত বছরের সব গ্লানি মুছে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়। দিনটি পালন করা হয় বাংলা রীতিতে নানা আয়োজনে।
মোঘল সম্রাট আকবর বৈশাখকে প্রথম মাস ধরে বাংলা বছর গণনা চালু করার পর থেকেই পহেলা বৈশাখের প্রচলন শুরু হয়। মোঘল আমলে হালখাতার অনুকরণে জমিদারদের কাছ থেকে বকেয়া রাজস্ব আদায়ের জন্য ‘পুণ্যাহ’ চালু করেন সম্রাট আকবর। একই নিয়ম মেনে বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁন পুণ্যাহ প্রচলন করেন। এ সময় খাজনা বা রাজস্ব পরিশোধ করতেন সবাই।
প্রাচীনকালের হালখাতা নবাবী আমলে নাম পাল্টে হয় পুণ্যাহ। কিন্তু পরে হালখাতা নামটিই প্রচলিত হয়ে পড়ে। এ দিন বছরের সব দেনা-পাওনা মিটিয়ে নতুন বছরের জন্য নতুন খাতা খোলেন ব্যবসায়ীরা। আনন্দ-আয়োজন আর আপ্যায়নে তা খোলা হয়ে থাকে।
হালখাতা বিষয়ে ইতিহাস থেকে আরও জানা যায়, হাল শব্দটি সংস্কৃত ও ফরাসি—দুটি থেকেই এসেছে। সংস্কৃতিতে হল বা হালের অর্থ লাঙল এবং ফরাসিতে হাল শব্দের অর্থ নতুন। লাঙলের ব্যবহার শেখার পর মানুষ স্থায়ী বসবাস শুরু করে। কৃষিজাত দ্রব্য বিনিময়ের প্রথা শুরু হয় তখন। এই লাঙল বা হালের মাধ্যমে চাষের ফলে উৎপন্ন দ্রব্যসামগ্রী বিনিময়ের হিসাব একটি খাতায় লিখে রাখা হত। সেই খাতার নাম ছিল হালখাতা।
পুরান ঢাকায় হালখাতা শত বছরের ঐতিহ্য। বৈশাখ মাসের প্রথম দিন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হালখাতা খোলার দিন। পুরনো হিসাব চুকিয়ে শুরু হয় ব্যবসায়ীদের নতুন খাতা খোলার পালা।
এবার হালখাতার অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে অন্যরকম আমেজ ও উত্তেজনা কাজ করছে ব্যবসায়ীদের মাঝে। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটিকে ঘিরে বরাবরই রঙিন সাজে মেতে ওঠে পুরান ঢাকা। পুরান ঢাকার সদরঘাট, তাঁতী বাজার, শাঁখারি বাজারের জুয়েলার্স ও অলংকার তৈরির কারখানা; শ্যামবাজারে সবজি ও কাচামালের আড়ত, চকবাজার ও ইসলামপুরের কাপড়ের দোকানগুলোতে হালখাতা হয়।
শাঁখারি বাজারের অলংকার ব্যবসায়ী দেবব্রত বলেন, ‘আমরা শাঁখারি ব্যবসায়ীরা নতুন বছরের এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করে থাকি। পুরাতন হিসাব চুকিয়ে নতুন হিসাব শুরুর দিন এটি। হালখাতা মানে যে শুধু পুরনো হিসাব চুকানো তা নয়, এটি আমাদের কাছে একটি উৎসব। করোনার কারণে গত দু’বছর হালখাতা বন্ধ ছিল। তবে হালখাতা অনুষ্ঠানের সেই আয়োজন বেশ কিছু বছর হলো আগের মতো আর নেই। পূর্বের হালখাতার এক দুই সপ্তাহ আগেই দোকান পাট সাজানো হতো। আগের মতো এখন আর অতো জমজাটভাবে অনুষ্ঠান হয় না।’
ইসলামপুরের বস্ত্র ব্যবসায়ী নজরুল হেসেন বলেন, ‘সারাবছর জুড়েই এখানে বাকিতে ব্যবসা চলে। ১লা বৈশাখ এলেই আমরা হালখাতা করে থাকি। নতুন টালি খাতা খুলে পুরনো হিসাব ক্লোজ করি। এই প্রথা যুগ যুগ ধরে চলছে।’
পুরান ঢাকায় হালখাতার যে ঐতিহ্য, তা ধরে রেখেছে ব্যবসায়ীরা। পূর্বের রীতিনীতি মেনে ব্যবসায়ীরা পহেলা বৈশাখে তাদের পুরনো খাতার পুরনো হিসাবে চুকিয়ে নতুন করে বেচাকেনা শুরু করেন।
.jpg)
.jpg)


.webp)

.jpg)

.jpg)