প্রিন্সেস ডায়না রূপ-লাবণ্যে এতটাই পরিপূর্ণ ছিলেন যে, তাঁকে দেখে মুগ্ধ হননি এমন ব্যক্তি হয়ত কমই আছে।
ব্রিটিশ রাজ পরিবারের পুত্রবধু হবার কারণে তিনি অসামান্য খ্যাতি আর বিলাসবহুল জীবনযাপনের সুযোগ তো পেয়েছিলেন বটেই, তবে এতো প্রাচুর্য আর আলোচনায় থাকার পরেও তার জীবন যেনো ছিলো নিষ্প্রাণ!
প্রিন্সেস ডায়নার জন্ম লন্ডনে হলেও তাঁর শৈশব কেটেছে সুইজারল্যান্ডে এবং তিনি পড়াশোনাও করেছেন সেখানে। পড়াশোনাতে অবশ্য তিনি তেমন কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতে পারেননি।
পরবর্তীতে তিনি আবার জন্মস্থান লন্ডনে ফিরে আসেন। সেখানে ১৯৭৭ সালে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে তাঁর চোখে চোখ পড়ে যায় ব্রিটিশ রাজপুত্র প্রিন্স চার্লসের।
প্রিন্স চার্লস ডায়নার সৌন্দর্য দেখে এতটাই মুগ্ধ হন যে, তিনি ডায়নাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। ডায়না সে প্রস্তাব গ্রহণ করেন।
তারপর কিছু নাটকীয়তার পর অবশেষে ১৯৮১ সালে মহা জাঁকজমকের সাথে আয়োজন করা হয় তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠান। তাঁদের এই বিয়ের অনুষ্ঠানটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের অনুষ্ঠানের একটি।
সে সময় টেলিভিশনের মাধ্যমে তাঁদের এ বিয়ের অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁদের দাম্পত্যজীবন মোটেও সুখের হয়নি। বিয়ের পর ডায়না বুঝতে পারেন তাঁর স্বামী প্রিন্স চার্লস একজন চরিত্রহীন। বহু নারীর সাথে রয়েছে তাঁর অবৈধ সম্পর্ক।
তবুও তিনি আশায় বুক বেঁধে ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন তাঁর স্বামীর এই চারিত্রিক দোষ হয়ত একদিন ঠিক হয়ে যাবে। এর মধ্যে, ডায়নার কোল আলো করে আসে তাঁর বড় ছেলে উইলিয়াম আর্থার ফিলিপ।
এরপর ব্রিটিশ রাজভবনের মধ্যে সীমাহীন অত্যাচারের শিকার হন ডায়না। সে সময় রাজভবনে একটি নিষ্ঠুর প্রথা ছিল।
রাজভবনের অন্তঃপুরে জন্মানো কোনো শিশুকে মায়ের স্তন্যপান করানো ছিল নিষিদ্ধ। ডায়না এই অমানবিক প্রথার প্রতিবাদ করেন এবং নিজের শিশু সন্তানকে পরম স্নেহে স্তন্যপান করান।
শুধু তাই নয়, রাজভবনের অন্তঃপুরে এসে ডায়না প্রত্যক্ষ করেন সভ্যতার নামে নগ্নতা, ভালোবাসার নামে নিষ্ঠুরতা, আভিজাত্যের নামে অমানবিকতা।
ডায়না এই সবকিছুর বিরোধিতা করেন। ফলে তিনি রাজ পরিবারের নিকটে হতে থাকেন নিন্দিত। কয়েক বছর পর ছোট ছেলে হেনরী চার্লস এলবারর্টের জন্ম হলে ডায়নার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাঁকে তালাক দিয়ে দেওয়া হয়।
এরপর ডায়নার জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। পৃথিবীর বিভিন্ন নামকরা পত্রিকা এ সময় ডায়নার বিরুদ্ধে সত্য মিথ্যা মিশিয়ে বিভিন্ন খবর ছাপাতে থাকে।
এই বিষাদময় পরিস্থিতিতে ডায়না বুঝতে পারছিলেন না, কোথায় গেলে তিনি শান্তি খুঁজে পাবেন। এমন সময় তাঁর সাথে পরিচয় হয় মিশর বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক মোহাম্মদ ডোডি আল ফায়েদ-এর।
তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী ডায়না তাঁর সাথে চলে আসেন ভারতে। এরপর ডায়না মানব সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। অনাথ শিশুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন।
এইডস রোগীদের সুস্বাস্থ্যের জন্য এবং এইডস রোগের প্রাদুর্ভাব হ্রাস করার জন্য কিনি জনমত গড়ে তোলেন। এছাড়া, ডায়নার আরও একটি কাজ যেটা পরবর্তীতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সেসময় কোথাও যুদ্ধ বাঁধলেই ব্যবহৃত হত স্থূলমাইন। এটা ব্যবহার নিষিদ্ধ করার জন্য তিনি ভারতের উচ্চপদস্থ নেতাদের সাথে কথা বলেন এবং জনমত গড়ে তোলেন। এভাবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর ডায়না ভারত থেকে ডোডির সাথে চলে যান প্যারিসে। সেখানে ডোডি ঘোষণা দেন ডায়নার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার।
কিন্তু তাঁদের বিয়ের এই পরিকল্পনা সফল হয়নি। এই ঘোষণা দেওয়ার পরের দিন একটি মর্মান্তিক রোড এক্সিডেন্টে দুজনেই নিহত হন।
তবে এই দুর্ঘটনার পেছনে অনেকেই রাজ পরিবারের দিকে আঙ্গুল তোলেন, হয়তো তা সত্য হতেও পারে আবার নাও হতে পারে!
কিন্তু ডায়নার মৃত্যুর খবরে পুরো পৃথিবী জুড়ে যেন নেমে আসে শোকের ছায়া। তাঁর প্রতি সকলের ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ তাঁর সমাধিতে তৈরি হয়ে যায় ফুলের পাহাড়।
ডায়না পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও, তাঁর মানবীয় গুণাবলির কারণে মানুষ তাঁকে আজীবন মনে রাখবে।