সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রা প্রায় দেড় কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি পারমাণবিক চুল্লি সূর্যের কেন্দ্রের চেয়ে ছয় গুণের বেশি তাপমাত্রায় পৌঁছাতে পারে।
এ কারণেই একে বলা হয় দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কৃত্রিম সূর্য’। এই চুল্লি এবার নতুন রেকর্ড গড়েছে।
প্রথম বারের মতো ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পৌছে ৩০ সেকেন্ডের বেশি সময় সেটি ধরে রাখতে পেরেছে। এর আগে বিশ্বের আর কোনো চুল্লি এমন তাপমাত্রা এত লম্বা সময় ধরে রাখতে পারেনি।
দক্ষিণ কোরিয়ার পারমাণবিক চুল্লিগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগে। এই চুল্লিগুলোর একটি কোরিয়া সুপারকন্ডাক্টিং টকামাক অ্যাডভান্সড রিসার্চ।
চুল্লিটি এর আগে ২০১৮ সালে ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে সেই তাপমাত্রা ৮ সেকেন্ড ধরে রাখতে পেরেছিল। এরপর অবশ্য বিভিন্ন দেশের কয়েকটি চুল্লি সেই রেকর্ড ভেঙে ১০ সেকেন্ড পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিল।
তবে ২০২১ সালেই ১০ কোটি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ২০সেকেন্ড ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল এটি। এর মাধ্যমে ভেঙে দিয়েছিল পূর্বের সকল রেকর্ড।
সূর্যের প্রাকৃতিক বিক্রিয়া অনুসরন করে আবিষ্কৃত "কৃত্রিম সূর্য" নিয়ে বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। তারা ধারনা করছেন বিজ্ঞানের এই উন্নতি মানবজাতিকে শক্তি সংকট মোকাবেলায় সাহায্য করবে।
তারা আরো বলেন, ফিউশনের মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় অসাধারন একটি উদ্যোগ। এটি দ্বারা মানবজাতির জন্য ক্ষতিকর গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরন হয় না।
এছাড়া উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় বর্জ্য উৎপাদনেরও সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে পারমানবিক ফিউশনের মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন আর স্বপ্ন নয়, রীতিমতো বাস্তব।
পারমাণবিক চুল্লিটি সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট বা ৩০০ সেকেন্ড ধরে চালিয়ে অধিক তাপমাত্রা উৎপাদনের চেষ্টা করছেন দক্ষিণ কোরিয়ার বিজ্ঞানীরা।
এ বছরের শেষ নাগাদ ১০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ৫০ সেকেন্ড ধরে রাখতে চান বিজ্ঞানীরা।
২০২৬ সাল নাগাদ তাদের লক্ষ্য হচ্ছে কৃত্রিম সূর্যের তাপমাত্রা ৩০০ সেকেন্ড বা ৫ মিনিট পর্যন্ত ধরে রাখা। ধীরে ধীরে তা বাড়ানো হবে, যাতে করে পরিবেশবান্ধব শক্তি পাওয়া যেতে পারে।
কৃত্রিম এই সূর্যের মাধ্যমে যে শক্তি পাওয়া যায়, তা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। এতে করে জ্বালানির সংকটও দূর করা সম্ভব হবে বলে বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণায় জানিয়েছেন।
কৃত্রিম সূর্য আবিষ্কারের ঘটনা অবশ্য নতুন কিছু নয়। এর আগে বেশ কিছু দেশের বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন উপায়ে কৃত্রিম সূর্য তৈরীর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।
২০০৬ সাল থেকে চীনা বিজ্ঞানীরা নিউক্লিয়ার ফিউশন চুল্লির সাহায্যে কৃত্রিম সূর্য আবিষ্কারের চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
গত বছর ডিসেম্বরে চীনের "এক্সপেরিমেন্টাল এডভান্সড সুপারকন্ডাক্টিং টোকামার্ক" নামক পারমাণবিক চুল্লি ১,০৫৬ সেকেন্ডে সর্বোচ্চ ৭০ মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উৎপাদনে সক্ষম হয় যা সূর্যের তুলনায় পাঁচ গুন বেশি।
তার আগে মে মাসে চুল্লিটি ১০১ সেকেন্ডে ২০ মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উৎপাদনে সক্ষম হয়েছিল।
এদিকে যুক্তরাজ্যও নিজস্ব ফিউশন রিঅ্যাকটর বানানোর কাজ করছে। ২০৪০ সাল থেকে এই ‘কৃত্রিম সূর্য’ তাপ উৎপাদন শুরু করবে বলে আশা করছেন গবেষকরা।
মূলত মানুষের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার পরিবেশবান্ধব উৎস তৈরিই ‘কৃত্রিম সূর্য’ বা পারমাণবিক চুল্লীর মূল লক্ষ্য।