এক সময়ের দুর্বল অর্থনীতির দেশ কাতার আজ বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ। তাদের মাথাপিছু আয় বিশ্বে সর্বোচ্চ।
মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে কাতার আয়তনের দিক থেকে ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র। ১৯৭১ সালে তারা ব্রিটেনের কাছে স্বাধীনতা লাভ করে।
দেশটির বেশিরভাগ এলাকা মরুভূমির দখলে ছিল। চাষাবাদ করার জন্য কোনো উপযোগী জমি ছিলো না। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেতো।
এখানকার মানুষেরা মাছ বিক্রি করে এবং মুক্তা চাষ করে কোনমতে জীবন চালাতো। জেলেদের দেশ হিসেবে পরিচিত গরীব কাতার ৫০ বছরের ব্যবধানে সবচেয়ে ধনী দেশে পরিণত হয়েছে।
মরুভূমির নিচে লুকিয়ে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগিয়ে দেশটি নিজের চেহারাই বদলে ফেলেছে।
তবে তারা প্রতিবেশীদের মতো শুধু খনিজ তেলই নয়, সেই সঙ্গে পেয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের খনি। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্যাসের খনি দ্য নর্থ ফিল্ড এদেশে অবস্থিত।
কিন্তু যে সময় এই খনি আবিষ্কার হয়েছে, সে সময়ে প্রাকৃতিক গ্যাস লাভজনক ব্যবসা ছিল না। কারণ ঐ সময়ে গ্যাস শুধুমাত্র পাইপের মাধ্যমে সরবরাহ করার ব্যবস্থা ছিল।
তবে দুর্গম জায়গা থেকে পাইপের মাধ্যমে অন্য কোথাও গ্যাস পৌঁছানো সম্ভব ছিলো না। তাই এতো সম্পদ থাকার পরেও দেশটি গরিবই থেকে যায়।
১৯৯৫ সালে দেশটিতে হামাদ বিন খলিফা আল থানী ক্ষমতায় আসেন। তিনি প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের নতুন পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেন।
এই পদ্ধতির নাম লিকুইফ্যাকশন বা তরলীকরণ। তরলীকৃত গ্যাস বড় বড় জাহাজে তেলের মতো পরিবহন করা যায়। গ্যাসকে তরলে পরিণত করার পর মাইনাস ১৬১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়।
কাতারের মতো মরুভূমির দেশে এই তাপমাত্রা ধরে রাখাটাও কঠিন ছিলো। পরবর্তীতে দেশটি এই প্রযুক্তিতে আরো বিপুল অর্থায়নের ফলে তাদের উৎপাদন বহুগুণে বেড়ে যায়।
ফলে ধীরে ধীরে কাতার বিশ্বের সবচেয়ে বড় লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস বা এলএনজি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়।
কাতারের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে বিশাল বিশাল ইন্ড্রাস্টিয়াল কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হয়। তাই গ্যাস উত্তোলন এবং তরলীকরণে পৃথিবীর যে কোনো দেশের তুলনায় কম খরচ হয়।
কাতারের একটি তরল গ্যাসের ট্যাঙ্ক ভরতে যে পরিমাণ খরচ হয়, আমেরিকায় তার উৎপাদন খরচ প্রায় চারগুণ বেশি।
কম দামে বেশি পরিমাণ তরল গ্যাস বা এলএনজি রপ্তানির কারণেই কাতার বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশের খেতাব অর্জন করতে পেরেছে।
এছাড়া খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে গেলেও কাতারের অর্থনীতি যাতে ভেঙে না পড়ে, সেজন্য তৎকালীন আমির হামাদ বিন খলিফা আরো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
তিনি ২০০৫ সালে কাতার ইনভেসমেন্ট অথোরিটি নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই প্রতিষ্ঠান সারা পৃথিবীতে বিনিয়োগ করে থাকে।
কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথোরিটি ৪০টিরও বেশি দেশে ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। লন্ডন শহরে ইংল্যান্ডের রানির চেয়েও বেশি সম্পদ আছে এই প্রতিষ্ঠানের।
এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে অফিস বিল্ডিং, হোটেল, অ্যাপার্টমেন্টসহ নানা ধরনের রিয়েল এস্টেট প্রজেক্ট। লন্ডন শহরের শীর্ষ ১৫টি আকাশচুম্বী অট্টালিকার ৩৪ শতাংশ কাতারের মালিকানাধীন।
এছাড়া ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ এবং লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরের ২০ শতাংশের মালিক কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথোরিটি। এমনকি রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ এয়ারপোর্টেরও ২৫ শতাংশের মালিক তারা।
নিউ ইয়র্কের প্রাণকেন্দ্র ম্যানহাটানে পাঁচ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে কাতার কর্তৃপক্ষ।
কাতার ইনভেসমেন্ট অথোরিটি বিশ্বের বিখ্যাত বেশ কয়েকটি কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার।
ভক্সওয়াগন, বার্কলেস ব্যাংক, শেল, উবার, আইবারড্রোলা, টিফানি এন্ড কোং এমনকি রাশিয়ার সরকারি তেল কোম্পানি রসনেফটে তাদের শেয়ার রয়েছে।
কাতার এয়ারলাইন্স পৃথিবীর অন্যতম সেরা এয়ারলাইন্সের স্বকৃীতি পেয়েছে। এই খাত থেকে প্রচুর আয় করে দেশটি।
এছাড়া আল জাজিরা সহ একাধিক চ্যানেল রয়েছে দেশটির। এসব খাত থেকেও বেশ লভ্যাংশ আসে তাদের।
প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য, শাসকদের সুপরিকপ্পিত পদক্ষেপ, আন্তর্জাতিক প্রভাব সব মিলিয়ে কাতার আজকের এই ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
উপসাগরীয় দুই দেশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে টক্কর দিয়ে এই সাফল্য কতদিন ধরে রাখতে পারবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।