হঠাৎ ঘুরে যাচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মোড়। সাড়াশি হামলায় কোনঠাসা হচ্ছে ইউক্রেন। অথচ মাসখানেক আগেও ছিলো ভিন্ন চিত্র, খারকিভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছিল রুশবাহিনী।
রাতারাতিই যেন পাল্টে গেছে পাশার ছক। নেপথ্যের নায়ক হিসাবে উঠে আসছে একজন ব্যক্তির নাম। তিনি দুর্ধর্ষ রুশ জেনারেল, সের্গেই সুরোভিকিন।
রাশিয়ার এই জেনারেল প্রতিপক্ষের জন্য যমদূতই বলা চলে। বিচক্ষণতার পাশাপাশি কৌশলের যুদ্ধে তিনি অনেক বড় বড় সেনাপতিদের চেয়ে বেশ এগিয়ে।
সম্প্রতি ক্ষমতা পেয়েই তিনি রাখছেন সামরিক সক্ষমতার চিহ্ন। পাল্টেছেন রণকৌশল। চাপ বাড়িয়েছেন কিয়েভের ওপর। রুশ সেনাদের পিছু হটার খবরে যেন আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছেন পুতিনের এই সেনাপতি।
রুশ বাহিনীতে জেনারেল সের্গেই সুরোভিকিনের আরেক নাম, জেনারেল আরামাগেডন। আরামাগেডন হচ্ছে বাইবেলে বর্ণিত শেষ যুগের ধর্মযুদ্ধ, যেখানে শুভ ও অশুভের লড়াই হবে।
১৯৬৬ সালের ১১ অক্টোবর, সাইবেরিয়ার নভোসিভিরস্ক শহরে তার জন্ম। পড়াশোনা ওমস্কের বিখ্যাত মিলিটারি একাডেমিতে।
সের্গেই তার কর্মজীবনে উন্নতি পেয়েছেন কঠিন পরিশ্রম আর নির্দয় স্বভাবের কারণে। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে, স্পেশাল ফোর্স স্পেতনাজের দুর্দান্ত সেনা ছিলেন সুরোভিকিন।
তিনি প্রথম আলোচনায় আসেন ১৯৯১ সালে। তখন ছিলেন চৌকষ গ্রুপ তামান গার্ডের ক্যাপ্টেন। মস্কোতে সোভিয়েত সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় সের্গেইয়ের নেতৃত্বাধীন বাহিনী। নিহত হয় গণতন্ত্রপন্থী ৩ বিদ্রোহী। সেখান থেকেই পদোন্নতি পেয়ে মেজর হন সুরোভিকিন।
২০০৪ সালে চেচনিয়ায় রুশ বাহিনীর ৪২তম গার্ডস মোটর রাইফেল ডিভিশনের নেতৃত্ব দেন সাফল্যের সাথে। এরপর ২০১৭ সালে সিরিয়া অভিযানে নিষ্ঠুর যুদ্ধকৌশল তাকে এনে দেয় রাশিয়ার সর্বোচ্চ সামরিক পদক ‘হিরো অব দ্যা রাশিয়া’ স্বীকৃতি।
তার নেতৃত্বে চালানো বিমান হামলায় সেই সময় সিরিয়ার আলেপ্পোর বেশিরভাগ অংশই ধ্বংস হয়ে যায়। ২০১৭ সাল থেকে ৫৫ বছর বয়সী সুরোভিকিন ছিলেন রাশিয়ার বিমান ও মহাকাশ বাহিনীর নেতৃত্বে।
চলতি বছরের জুনে ইউক্রেনে রুশ সেনার দক্ষিণাঞ্চলের সামরিক প্রধানের দায়িত্ব পান জেনারেল আরমাগেডন। ক্রিমিয়ার কের্চ ব্রিজ আক্রান্ত হয় যেদিন, সেদিনই আসে তার নতুন পদোন্নতির ঘোষণা। সেখান থেকেই ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সকল বাহিনীর প্রধান হিসাবে অধিষ্ঠিত হন সের্গেই সুরোভিকিন।
সামরিক অভিযানে ক্ষয়ক্ষতির দিকে মনোযোগ দিতে মোটেই আগ্রহী নন তিনি। বোমারু বিমান ও কামানের ব্যবহার তার প্রিয় যুদ্ধ কৌশল।
সেই কথার প্রমাণ রাখতেই যেন সম্প্রতি বহুগুণে ইউক্রেনে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে কেএইচ–101, ক্যালিবারের মতো অত্যাধুনিক রাশিয়ান মিসাইল।
একের পর এক দূরপাল্লার মিসাইলের আঘাতে কেঁপে ওঠে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর। ৯০০ কিলোমিটার দূরের কাস্পিয়ান সাগর থেকে এসব হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া।
মার্কিন প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘জেমসটাউন ফাউন্ডেশন’- বলছে, রণক্ষেত্রে বর্বরতার জন্য রুশ এই সামরিক কর্মকর্তা তুলনাহীন। কিয়েভ, খারকিভ, জাপোরিঝিয়া'সহ ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর বহন করছে রুশ মিসাইলের ধ্বংসচিহ্ন। লণ্ডভণ্ড এলাকার পর এলাকা।
ইউক্রেনে মার্কিন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং সমরাস্ত্র পাঠানো নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয় বলে জানিয়েছে রাশিয়া। এসব উদ্যোগে দীর্ঘায়িত হবে যুদ্ধের পরিধি। নতুন যুদ্ধকৌশল বাস্তবায়ন শুরুর পরপরই এলো রাশিয়ার এমন হুঁশিয়ারি।
চলমান ধ্বংসযজ্ঞ শেষে আদৌ কি টিকে থাকবে ইউক্রেনের বর্তমান মানচিত্র? কী বা আছে বিধ্বস্ত কিয়েভের ভাগ্যে? অনেক অমিমাংসিত প্রশ্ন উঠছে।
শীঘ্রই হয়তো পাওয়া যাবে এসব অমিমাংসিত প্রশ্নের উত্তর। তার হাত ধরেই বদলে যাবে যুদ্ধের পুরো চিত্রটাই! সের্গেই কি তাহলে হবেন ইউক্রেন ধসের নায়ক? নাকি অপেক্ষা করছে নতুন কোনো মোড় সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।