কিছুদিনের মধ্যেই ক্ষমতার এক দশক পূর্ণ করতে চলেছেন গণচীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সেই সাথে তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হয়ে চীনের ইতিহাসে গড়তে চলেছেন এক অনন্য রেকর্ড।
তৃতীয় মেয়াদে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির এই নেতার জয় অনেকটাই নিশ্চিত। ফলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক দেশের শাসন এবারও শি এর আয়ত্তেই থাকছে বলে আশা করা যায়।
চীনা সংবিধানে দুইবারের বেশি প্রেসিডেন্ট হওয়ার ব্যাপারে যে বিধিনিষেধ ছিলো ২০১৮ সালে তা সংশোধন করা হয়। এতে সম্প্রসারিত হয়ে যায় শি'র তৃতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার দরজা।
দলীয় একচ্ছত্র আধিপত্য ছাড়াও বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে অর্জন তাকে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতার আসনে বসতে সহায়তা করছে।
চীনের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতাদের তালিকায় আধুনিক চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুংয়ের পরপরই শি'র অবস্থান। দেশটির ইতিহাসে মাও সেতুংয়ের যে মর্যাদা, সমপরিমাণ মর্যাদা রয়েছে শি'র।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টি শি'র চিন্তাধারাকে দলীয় গঠনতন্ত্রে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করে।
আর মাও সেতুংয়ের পর শি'ই দ্বিতীয় ব্যাক্তি যিনি ক্ষমতায় অবস্থান করে নিজের চিন্তাভাবনাকে দলীয় গঠনতন্ত্রে মতাদর্শের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন।
ফলে আধুনিক চীনের রুপকার মাও সেতুং যেভাবে নিজের মতবাদকে মাও-বাদ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পেরেছিলেন, একই ভাবে শি এর চিন্তাধারাও রুপ নিবে শি-বাদ হিসেবে।
সেই সাথে শি-মতবাদের বিরুদ্ধে যেকোনো চ্যালেঞ্জ বিবেচিত হবে কমিউনিস্ট পার্টির বিরোধ হিসেবে। শি জিনপিং চীনের প্রেসিডেন্ট পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন ২০১২ সালের ১৫ নভেম্বর।
দশ বছর প্রেসিডেন্ট পদে বসে জিনপিং একে একে দেশের দারিদ্র্য দূরীকরণ, দুর্নীতি দমন, গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন, পরিবহন ও প্রযুক্তির উন্নয়নসহ বিভিন্ন গঠনমূলক কাজে সফলতা দেখিয়েছেন।
শি এর প্রেসিডেন্ট মেয়াদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নেওয়া হয়েছিলো চীনের দারিদ্র্যতা দূরীকরণকে। ২০২০ সালে দেশকে দারিদ্রমুক্ত করার জন্য তার নেতৃত্বকে কৃতিত্ব দিয়েছিলো চীন।
জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, শিক্ষার অধিকার প্রদান, ঘরে ঘরে গিয়ে গবাদি পশুগুলোর অবস্থা পর্যালোচনা, লাখো গ্রামীন পরিবারকে অর্থনৈতিক সুবিধা প্রদান ও তাদের বাস্তুসংস্থানের মাধ্যমে শিয়ের অধীনে দারিদ্র্য জয় করতে পেরেছে দেশটি।
তিনি ক্ষমতায় বসার প্রথম বছরটিতে চীনে দারিদ্রের সংখ্যা ছিলো ৮২ মিলিয়ন। ক্ষমতার আট বছর পর তা কমে এসেছে ছয় মিলিয়নে, যা চীনের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মাইলফলক।
দেশের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হিসেবে দূর্নীতি দমনেও বিশেষ নজর রেখে গিয়েছেন শি জিনপিং।
ক্ষমতার দশ বছরের মধ্যে সামরিক-বেসামরিক কর্মচারী, মন্ত্রী থেকে শুরু করে সেনা জেনারেল পর্যন্ত প্রায় এক কোটি তেরো লক্ষ লোককে শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি।
দুর্নীতির অভিযোগে কমপক্ষে ১৫ লক্ষ লোককে চরম শাস্তি হিসেবে দেওয়া হয়েছে মৃত্যুদণ্ডও।
অন্যদিকে, মহাকাশ অভিযানের অন্যতম পরাশক্তি চীন। এই প্রতিযোগিতায় আরও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং রাশিয়ার মতো দেশগুলো।
শি এর প্রচেষ্টায় এই দেশগুলোর সাথে চীনের মহাকাশ প্রতিযোগিতার ব্যবধান অনেকাংশে কমেছে।
২০১৩ ও ২০১৯ সালে চাঁদে রোভার্স পাঠানো, ২০২০ সালে মনুষ্যবিহীন মহাকাশযান পাঠিয়ে চাঁদের নমুনা সংগ্রহ, এই সব মহাকাশ সাফল্যে চীন অবদান রাখতে পেরেছে শী জিনপিং ক্ষমতায় বসার পর।
অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার পাশাপাশি চীনকে বিশ্বের সবচেয়ে কম কার্বন নির্গমনকারী দেশ হিসেবে গড়ে তোলতেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন শি।
দেশকে সবুজ করে তোলতে আগামী দশ বছরের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ সর্বোচ্চ কমানোর পদক্ষেপ নেন তিনি। সেই সাথে ২০৬০ সালের মধ্যে দেশকে কার্বন নিরপেক্ষ দেশে পরিনত করতে প্রতিশ্রুতি দেন।
পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নেও ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন চীনের এই প্রেসিডেন্ট। ক্ষমতার এক দশকের মধ্যে হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য বাড়িয়েছেন চার গুন।
বিগত দশ বছরে দেশে বেসামরিক বিমানবন্দর নির্মান করেছেন ৮২টি, বেড়ে গিয়েছে বিমান যাত্রীর সংখ্যাও। এছাড়াও প্রতিবছর প্রযুক্তি খাত সহ আরও অনেক খাতে বিভিন্ন যুগান্তকারী অর্জনতো রয়েছেই।
কিন্তু শি এর তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় বসার পেছনে কিছুটা বাধাও রয়েছে। আবাসন খাতে ধস, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির টানা অবনতি, রাশিয়া-ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার প্রতি অব্যাহত সমর্থন এবং তাইওয়ান ইস্যুতে পশ্চিমা চাপকে ঘিরে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাকে।
পাশাপাশি জিরো কোভিড নীতিকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে চীনা নাগরিকরা। তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে শি জিনপিং এর হাত ধরে বিগত দশ বছরে চীনের উন্নয়ন পৌঁছে গিয়েছে এক অন্য মাত্রায়।