ব্রাজিলের নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন লুলা ডি সিলভা। তিন ইস্পাত কারখানার শ্রমিক হিসেবে রাজনীতিতে উঠে আসেন, ছিলেন ট্রেড ইউনিয়েনের নেতা৷
বামপন্থী এই রাজনীতিবিদ ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। পরে দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন তিনি।
অবশেষে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শে বিশ্বাসী এই নেতার পুনরুত্থান ঘটলো। তার এই পুনরুত্থান ব্রাজিলের রাজনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।
বৈশ্বিক অর্ডার পরিবর্তনের যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, সেখানেও সিলভার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে৷ নির্বাচনে জয়ের পর দেয়া এক ভাষণে সিলভা বলেছেন, 'আমি আজ বিশ্বকে বলতে চাই, ব্রাজিল ফিরে এসেছে। কেননা বিভক্ত জাতিতে, যুদ্ধের আবহে কেউ বাঁচতে পারে না।'
সিলভার সাথে রাশিয়া ও চীনের সুসম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ক সামনের দিনে আরো শক্তিশালী হবে, যা পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব ব্যবস্থাকে একটা বড়সড় ঝাকুনি দিতে পারে।
অনেক আগে থেকেই চীন ও রাশিয়া বৈশ্বিক অর্ডার পরিবর্তনে কাজ করছে। এই যাত্রায় তাদের সাথে ব্রাজিলের সংযোগ নতুন এক মাত্রা যোগ করবে।
সিলভার জয়ে ল্যাটিন আমেরিকায় চীনের প্রবেশ আরো সহজ হবে, চীনের আধিপত্য বিস্তারের পথ সুগম হবে।
রাশিয়ার জন্যও রয়েছে সুখকর বার্তা। বিশ্বের যে কয়েকটি রুটির ঝুড়ি রয়েছে তার মধ্যে ব্রাজিল একটি। পশ্চিমাদের চাপে রাখতে পুতিন ও সিলভা কোনো পদক্ষেপ নিলে পশ্চিমা শক্তির পক্ষে তা সামাল দেয়া কষ্টকর হয়ে যাবে।
সিলভার জয়ের মাধ্যমে বৈশ্বিক রাজনীতির নতুন পথ তৈরির যাত্রা আরো উজ্জ্বল হলো। বিগত বছরগুলোতে ডানপন্থী পপুলিস্ট নেতাদের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল।
বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে এই পপুলিস্ট নেতারা জয় পেয়েছিল। ব্রাজিলের বলসেনারো, ব্রিটেনের বরিস জনসন, যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভারতের নরেন্দ্র মোদির মতো নেতারা প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক অর্ডারে নেতামি করেছেন।
সিলভার জয়ে তাদের এই উত্থানে ভাটা পড়বে। ইতোমধ্যে ইউরোপের রাজনীতিতে পপুলিস্টের পতন ঘটতে শুরু করেছে। পুতিন পন্থী অতি ডানপন্থী নেতাদের উত্থান ঘটতে শুরু করেছে।
সিলভার জয়ে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে সমাজতন্ত্রের প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে, যেটাকে অনেকে গোলাপি ঢেউ বলে অভিহিত করছেন৷ এই ঢেউ বৃদ্ধি পেলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের নেতা যুক্তরাষ্ট্রকে বেশ অসুবিধায় পড়তে হবে।
সিলভার জয়ে BRICS জোট আরো শক্তিশালী হবে। এই জোট অনেক দিন ধরেই ডলারের আধিপত্য কমাতে ডলারের বিপরীত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
ব্রাজিল, চীন ও রাশিয়া একই মতাদর্শ লালন করায় এই কাজে গতি আসবে এটা স্পষ্ট। সম্প্রতি সৌদি আরব BRICS জোটে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সৌদি যুক্ত হলে এই জোট যে অধিক প্রভাবশালী হয়ে উঠবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সিলভার জয় বৈশ্বিকভাবে অনেক প্রভাব ফেলবে এতে সন্দেহ নেই। তবে সবকিছুর আহে এই নেতাকে নিজের দেশ গোছাতে হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাকে মোটাদাগে তিনটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।
প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো ব্রাজিলের জনগণের দারিদ্র্য দূর করা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বলসোনারোর সময়ে প্রায় চারকোটি মানুষ খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে পড়েছে, দারিদ্র্যের কবলে পড়েছে ১০ কোটি মানুষ।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হল আবাসন খাতে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হল আমাজন বন নিয়ে গৃহীত বলসোনারোর নীতির বিপরীতে কাজ করা।
চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সুলভার জন্য একটু কঠিনই হয়ে পড়বে। কেননা ব্রাজিলের জাতি এখন বিভক্ত হয়ে গেছে। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠাও সিলভার জন্য একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ বটে।
দারিদ্র্য নিরসনের জন্য সিলভার প্রণীত 'বোলসা ফ্যামিলিয়া পোভার্টি রিলিফ পোগ্রাম' কথা অনেকেই স্মরণ করেছেন। সিলভা তার প্রথম মেয়াদে এটি চালু করেছিলেন।
এই পোগ্রামের আওতায় গরিব পরিবারগুলোকে মাসে ১১০ ডলার দেয়া হতো। ছয় বছরের কম বয়সী শিশু থাকলে আরো বাড়তি ৩০ ডলার দেয়া হতো। ব্রাজিলের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই পোগ্রাম চালিয়ে নেয়া সিলভার জন্য কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে আমাজন বন রক্ষায় সিলভা কোনো উদ্যোগ নিলে তা পার্লামেন্টে পাশ করা কঠিন হয়ে যাবে। এর কারণ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সাথে জড়িত অনেক কংগ্রেসম্যান বলসোনারোকে সমর্থন দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে লুলা ডি সিলভা এগিয়ে গেলে বৈশ্বিক অর্ডারে ব্যাপক এক পরিবর্তন আসবে।
আর এই পরিবর্তন যে পুজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থার নেতারা মেনে নিবেন না এটা স্পষ্ট। এজন্য বিশ্ব আগামীতে মতাদর্শিক দ্বন্দের নতুন বিবাদ প্রত্যক্ষ করবে এমনটা বললে নিশ্চয় ভুল হবে না।