স্বচ্ছল জীবনযাপন এবং উন্নত কর্মসংস্থানের কথা ভেবে আমেরিকার নাগরিকত্ব পাওয়া অধিকাংশ মানুষের স্বপ্ন। কিন্তু এ স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা খুব একটা সহজ কাজ নয়।
আমেরিকায় বৈধভাবে যাতায়াতের জন্য দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নানা ধরণের ভিসা চালু করে রেখেছে । তার মধ্যে ডিবি লটারি ভিসাটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিবছর এই ভিসাটির মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে স্থায়ীভাবে আমেরিকার নাগরিকত্ব পেতে দেখা যায়।
ডিবি লটারির মাধ্যমে যাতায়তের ব্যাপার কিংবা নাগরিকত্ব পাওয়াটা পূর্বের তুলনায় সহজ হলেও, আমেরিকায় ভালোভাবে থাকার ব্যবস্থাটা নিজেকেই করে নিতে হয়।
বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষের ধারণা ভাগ্যক্রমে কেউ একবার আমেরিকায় যেতে পারলে কাঁড়ি কাঁড়ি ডলারের দেখা মিলবে।
কিন্তু সত্যিকারার্থে পরিশ্রম ছাড়া জীবন কোথাও সহজ নয়। কোন উন্নত রাষ্ট্রে গেলেই মানুষ ভালো থাকবে ব্যাপারটা তেমন নয়। কে কতোটুকু ভালো থাকবর তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সে ভালো থাকার জন্য কতোটা পরিশ্রম করছে।
কোনো দেশের উচ্চবিত্ত পরিবারের কেউ যদি আমেরিকায় স্থায়িভাবে থাকতে চান, সেক্ষেত্রে তাকেও কোন না কোন কাজ করতে হবে। দেশ থেকে টাকা এনে আমেরিকার মাটিতে শুরুতেই রাজকীয়ভাবে থাকা সম্ভব নয়।
এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা উচ্চশিক্ষিত হয়েও উন্নত এই রাষ্ট্রে গিয়ে ভালো কিছু করতে পারেন না।
আমেরিকায় যারা প্রবাসী হয়ে আসেন, তাঁদের শুরুর জীবন কতটা কষ্টের তা বাংলাদেশেন মানুষ অনুধাবন করতে পারেন না।
এখানে জীবনের শুরুর দিকটা থাকা-খাওয়া থেকে শুরু করে সবকিছুতেই কষ্ট। পরিচিত কেউ থাকলে কিছুদিন সাপোর্ট পাওয়া যায় হয়তো, কিন্তু তা না থাকলে পড়তে হয় বিপদে।
আমেরিকায় অভিবাসী মানুষের জীবন শুরু হয় ‘অড জব’ অর্থাৎ লো ইনকাম জবের মাধ্যমে। বেঁচে থাকার জন্য একটা ছোটখাটো কাজ করতেই হয় এখানে।
জীবিকার জন্য কেউ রেস্তোরাঁ কিংবা কফি শপে ওয়েটার হিসেবে কাজ করে, কেউ হোস্ট হিসেবে গ্রাহকদের স্বাগত জানানো, তাদের বসানো এবং মানসম্পন্ন পরিষেবা নিশ্চিত করে।
এছাড়াও লো ইনকাম জবের মধ্যে আছে রাঁধুনি, চাইল্ডকেয়ার, গৃহকর্মী, কাউন্টার কর্মী, খুচরা দোকানের ক্যাশিয়ার, লাইফগার্ড কর্মী, ডিশওয়াশার, লন্ড্রি এবং ড্রাই-ক্লিনিং শ্রমিক।
তবে লো ইনকাম জব করতে চাইলেও প্রয়োজন কারও না কারও রেফারেন্স এবং নিজ অভিজ্ঞতার। পরিচিত কারো রেফারেন্সে ছোটখাটো একটা জব শুরু করা যায় খুব তাড়াতাড়ি।
কেউ চাইলে একসঙ্গে দুটি ‘অড জবও’ করতে পারেন। তবে স্টুডেন্টদের ক্ষেত্রে ফুলটাইম স্টাডির সঙ্গে দুটি চাকরি করা সম্ভব নয়।
ইমিগ্রান্ট কিংবা প্রবাসীদের মধ্যে যারা তরুণ তাঁরা পড়াশোনা করে ডিগ্রি লাভের পর পেশাদার চাকরির চেষ্টা করতে পারেন। পড়াশোনা চলাকালে যদি গ্রীষ্মের ছুটিতে ইন্টার্নশিপ করেন তাহলে পড়াশোনা শেষে চাকরি পাওয়া সহজ হয়।
উদাহরণ হিসেবে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ুয়া কোন বাঙালির কথা বলা যায়। তার যদি আমেরিকার গ্রিনকার্ড থাকে, তাহলে সে ‘মাস্টার্স করার আগেই প্রশিক্ষণ নিয়ে আইটি কনসালটিং করতে পারে।
সেমিস্টার শেষে আইটি ট্রেইনিং করে যে কোন কনসালটিং কোম্পানিতে জয়েন করা যায়। কিন্তু একটা পারমানেন্ট চাকরি ছাড়া কারোরই স্বস্তি হয় না। তাই পাশাপাশি সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করেন সবাই।
ইমিগ্রান্টদের মধ্যে যারা আমেরিকায় গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে, তাঁরা চাইলেই কনসালটিং কোম্পানির মাধ্যমে চাকরি খুঁজে নিতে পারেন।
আর যারা দেশ থেকেই কম্পিউটার সায়েন্স, ইলেকট্রিক্যাল বা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করে, তাঁরা আইটি প্রশিক্ষণ নিয়ে কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ শুরুর চেষ্টা করেন।
আমেরিকাতে প্রবাসী হয়ে সপরিবারে আসা ব্যক্তিরা সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়েন। পরিবার-পরিজন থাকলে পড়াশোনা করাটা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়।
তখন সংসার চালানোই মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
তারা ছোটখাটো ব্যবসা করে কোনমতে উন্নত এই রাষ্ট্রে নিজেকে টিকিয়ে রাখেন।
ডিভি লটারি পাওয়া ব্যক্তিদের একটা বড় অংশই ছিল ছাত্র। যারা সেখানে যাওয়ার পরেও পড়াশোনা কন্টিনিউ করে দেশটিতে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে নিতে পেরেছে।
মূলত ডিভি লটারি পেয়ে আমেরিকাতে আসলেই ভালো থাকা সম্ভব হয় না, সব রকম কষ্ট করে ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের উচ্চপদে সম্মানজনক পেশায় কাজ করতে হলে প্রচুর অধ্যাবসায়ী হতে হয়।
নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের বাঙালি পাড়া বাংলাদেশীদের জন্য তুলনামূলক সুবিধাজনক। এখানে নিজ দেশের মানুষের থেকে নানা ধরণের সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায়। ক্যারিয়ার গড়ার সংগ্রামটা এই পাড়ায় থেকে করলে কিছুটা সহজ হয়।
প্রতিবছর দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ডিভি লটারির আয়োজন করে থাকে। এই লটারিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কোটি কোটি মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
তবে অংশগ্রহণ করা মাত্রই স্বপ্নের দেশটিতে যাওয়া সম্ভব হবে, ব্যাপারটা এমন নয়। কোটি কোটি মানুষ থেকে ভাগ্যের জোরে যারা ডিবি লটারির মাধ্যমে বিজয়ী হবেন, কেবলমাত্র তারাই আমেরিকা যেতে পারবেন।
লটারিতে বিজয়ী ব্যক্তিরা ভিসা নেওয়ার সময় নির্ধারিত একটি ফি জমা দিয়ে থাকেন।
ডিভি ভিসার বাস্তবায়নের মাধ্যমে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের মানুষই পূর্বের তুলনায় কিছুটা সহজ উপায়ে আমেরিকার ভিসা পায়।
আমেরিকায় ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সম্মেলন দেখা যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দিয়ে জাতিগত এক মহা সন্মেলনের সৃষ্টি করেন।