
অস্ত্র-সস্ত্র, বোমা-বারুদ বা পারমাণবিক শক্তি, কোন দিকেই কমতি নেই রাশিয়ার। তবে ইউক্রেন আক্রমনের পর থেকে ভিন্ন এক সমর কৌশল ব্যবহার করছে দেশটি। উৎপাদিত তেল শক্তিকে রীতিমত ঢাল হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে তারা। এদিকে রাশিয়ার তেলের উপর পুরো বিশ্ব অনেকাংশে নির্ভরশীল। একইভাবে ইউরোপিয়ান দেশগুলো চরমভাবে দেশটির তেলের উপর নির্ভর করে আসছে। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের অভিযোগ, তেল বিক্রির মুনাফা সম্পূর্ন খরচ হচ্ছে ইউক্রেন যুদ্ধে। তাই তেলের উপর নিষেধাজ্ঞা না দিয়ে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেধে দিয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। সমুদ্রগামী জাহাজের মাধ্যমে প্রতি ব্যারেল ৬০ ডলারের চেয়ে বেশি দামে তেল বিক্রি করা যাবে না। ৬০ ডলারের বেশি মূল্যে বিক্রি করতে গেলে, অনেক ধরণের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হবে তারা। এর মধ্যে জাহাজের ইন্স্যুরেন্স, বীমা সংক্রান্ত সমস্যা অন্যতম। অর্থাৎ জাহাজগুলো ইন্স্যুরেন্স বা বীমা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। আর ইন্স্যুরেন্স বা বীমা কোম্পানীগুলো বেশিরভাগই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। তবে তেলের দামে ভাটা টেনে উল্টো বিপদে পড়েছে পশ্চিমা মিত্ররা। ঘোষনার পরের দিনই তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেলের দাম ৮৭ ডলারের ওপরে উঠে যায়। ধারণা করা হচ্ছে ব্যারেল প্রতি দাম ৯৫ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। এর প্রধান কারণ রাশিয়ার তেল সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া। রাশিয়া ছাড়া অন্যসব শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো ইতিমধ্যে তেলের উৎপাদন কমিয়ে এনেছে। সব মিলিয়ে তেলের বাজারে অস্থিরতা চরমে পৌঁছে গেছে। অন্যদিকে রাশিয়ার তেলের ব্যবসা ঠিকই চলমান আছে। চীনে কোভিড বিধি-নিষেধ শিথিল হওয়ার পর, তাদের শিল্প উৎপাদনে তেলের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। যার ফলে রাশিয়ান তেলের চাহিদা আগের মতোই আছে। পাশাপাশি ভারতও রাশিয়ান তেলের অনেক বড় ক্রেতা। শুধু ভারত বা চীন নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ এখন রশিয়ান তেলের বড়ো বাজারে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি এশিয়ান দেশগুলোও রাশিয়ান তেলের দিকে ঝুঁকছে। এক কথায়, বাজারে চাহিদা থাকলে রাশিয়া যেকোনো ভাবেই নিজস্ব মূল্যে তেল বিক্রি করতে পারবে। তাছাড়া ইউরোপিয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা নির্ভর করছে ব্যাংক বা বীমা কোম্পানীগুলোর উপর। কোম্পানীগুলো বেশিরভাগই ই ইউ বা জি সেভেন ভুক্ত হলেও এদের বাইরে আরো অনেক বীমা বা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী আছে। তারা এই নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে বাধ্য নয়। চাইলেই ভুয়া মূল্যের কাগজ দেখিয়ে রাশিয়া থেকে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে তেল কেনাবেচা সম্ভব। বিশ্লেষকরা মনে করছে, নিজেদের ব্যবসা ধরে রাখতে, বীমা কোম্পানিগুলোর এমন পথ বেছে নেওয়ার সম্ভবনা বেশি। তাছাড়া তেল বেচা-কেনায় নিজস্ব ইন্স্যুরেন্স বা জাহাজের সক্ষমতাও আছে রাশিয়ার। মূলত নিষেধাজ্ঞার আভাস পেয়ে, বাইরে থেকে শখানেক জাহাজ কিনে রেখেছে মস্কো।সেই সাথে তেল আমদানি রপ্তানির ক্ষেত্রে বেনামী জাহাজের ব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এইসব জাহাজ মুলত ইউরোপিয়ানদের নাগালের বাইরে। তাছাড়া এক ব্র্যান্ডের তেলের সঙ্গে আরেক ব্র্যান্ডের তেলের মিশ্রণ ঘটালে, কোনো ভাবেই তেলের উৎপত্তি স্থল শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। তেল কালো বাজারিতে এই পন্থা বেশ আগে থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে।আর চাইলেই, মাঝ সমুদ্রে এক ট্যাংকার থেকে আরেক ট্যাংকারে তেল সরিয়ে নেওয়া সম্ভব। এমন অনৈতিক কর্মকান্ডের ফলে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে বেশ কয়েকটি দেশ। বিশেষ করে ফ্রান্স, ইতালি বা নেদারল্যান্ডের মত দেশগুলো, যাদের বেশিরভাগই রাশিয়ার তেলের উপর অতি মাত্রায় নির্ভরশীল। অন্যদিকে রাশিয়ার ব্যবসা ঠিকই চলমান থাকবে।


