ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে প্রাণ হারালেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেনিস মোনাস্তিরস্কি সহ অন্তত ১৬ জন। গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ১৫ জন।
স্থানীয় সময় সকাল ৮টা নাগাদ হয় এ দুর্ঘটনা। মর্মান্তিক ওই ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরও দুজন সিনিয়র কর্মকর্তা নিহত হন।
তাঁরা হলেন ফার্স্ট ডেপুটি মিনিস্টার ইয়েভহেন ইয়েনিন ও স্টেট সেক্রেটারি ইউরি লুবকোভিচ।
কর্তৃপক্ষ জানায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের বহন করছিলো হেলিকপ্টারটি। এরপর হঠাৎই ব্রোভারি এলাকায় একটি কিন্ডারগার্টেনের স্কুলের ভবনে আঘাত করে- একটি আবাসিক ভবনের সামনে বিকট শব্দে বিধ্বস্ত হয় সেটি।
মুহুর্তেই ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়ে গোটা ভবনে। আগুন লেগে যায় পাশের আরেকটি ভবনেও।
দুর্ঘটনার সময়কার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এতে দেখা যায়, কালো ধোয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে গোটা এলাকা। ভেসে আসছে মানুষের আর্তচিৎকারের আওয়াজ।
দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ১৬ জন। নিহত এই মন্ত্রী ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট ভলোদেমির জেলেনস্কির অধীনে নিয়োগ পেয়েছিলেন।
নিহতদের তালিকায় তিন শিশুও রয়েছে। যারা ওই স্কুলেরই শিক্ষার্থী। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ চালায় ফায়ার সার্ভিস। সরিয়ে নেয়া হয় শিশু ও কর্মীদের।
ইউক্রেনের জাতীয় পুলিশ প্রধান ইহোর ক্লাইমেনকো ফেসবুকে লিখেছেন, বিধ্বস্ত হওয়া হেলিকপ্টারটি ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় জরুরি পরিসেবার কাজে ব্যবহার করা হতো।
ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন শুরুর পর, কিয়েভের এত শীর্ষপদস্থ কর্মকর্তার মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম। যাকে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে কিয়েভের জন্য।
কর্তৃপক্ষ জানায়, যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য ওই কর্মকর্তারা যাচ্ছিলেন হেলিকপ্টারে। রুশ ক্ষেপণাস্ত্র আর রকেট হামলা এড়াতে খুব নিচ দিয়ে উড়ে যাচ্ছিলো হেলিকপ্টারটি। এতেই ঘটে বিপত্তি।
তবে এটি নিছক দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা, তা নিয়ে চলছে তদন্ত। কিয়েভ প্রশাসনের শঙ্কা, রাশিয়ার পরিকল্পিত নাশকতা হতে পারে এটি। তাই রুশ ফেডারেশনের সম্ভাব্য সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়েও তদন্ত চালাবে কর্তৃপক্ষ।
বুধবার সকালের ঘটনাকে রুশ হামলা হিসেবে সন্দেহের পেছনে দুটি কারণকে জোর দিচ্ছে জেলেনস্কি প্রশাসন।
প্রথমত, সম্প্রতি ইউক্রেনীয় সেনাদের হামলায় কয়েকশ রুশ সেনা প্রাণ হারিয়েছে। যা নিয়ে ক্ষিপ্ত রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র সহ বেশ কয়েকটি মিত্র দেশ ইউক্রেনকে নতুন করে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র সরবরাহের ঘোষণা দিয়েছে। যা নিয়ে রুশ দখলকৃত বেশ কিছু অঞ্চলে হামলা জোরদার করেছে ইউক্রেনীয় সেনারা।
ফলশ্রুতিতে এর পাল্টা জবাব হিসেবে এমন কাণ্ড ঘটাতে পারে মস্কো। যদিও এ নিয়ে এখনও সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি কিয়েভ। মস্কোর পক্ষ থেকেও কোনো দায় স্বীকার করা হয়নি।
তবে হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হওয়ার সময় আবহাওয়া পরিস্থিতিও কিছুটা খারাপ ছিল। অন্ধকার ও কুয়াশাচ্ছন্ন ছিল পরিবেশ। যার ফলে ভুলক্রমে পাইলট ভবনে আঘাত করে ফেলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে রুশ হামলায় হেলিকপ্টার বিধ্বস্তের ঘটনাটি ঘটে থাকলে, এ নিয়ে ফের ভ্লাদিমির পুতিন চাপের মুখে পড়বেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কারণ কিয়েভও চুপচাপ বসে থাকবে না। আর জেলেনস্কি প্রশাসনের সহায়তায় এগিয়ে আসবে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্ররা। যা যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও দীর্ঘায়িত করবে বলে শঙ্কা তাদের।
আগামী ফেব্রুয়ারি মাসেই বছর গড়াবে রুশ ইউক্রেন যুদ্ধের। তবে সম্প্রতি বেশ কিছু ঘটনায় বদলে গেছে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি।
কিছুদিন আগে রাশিয়ার পক্ষ থেকে সমঝোতার কথা জানায় পুতিন প্রশাসন। কিন্তু এর কয়েকদিনের মাথায় রুশ সেনাদের ওপর হামলার ঘটনায় ফের ক্রুদ্ধ হন তিনি। বাড়ান হামলার মাত্রা।