ক্রিমিয়া উপদ্বীপ রাশিয়ার জন্য ভূ- কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া দখল করেছিলো রাশিয়া।
ক্রিমিয়ার সেভাস্তোপোল বন্দর রাশিয়ার অন্যতম নৌঘাঁটি। কৃষ্ণ সাগরে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে এই বন্দর প্রয়োজন তাদের।
তাছাড় রাশিয়া শীত প্রধান দেশ। এর প্রধান বন্দর ভ্লাদিভস্তক প্রশান্ত মহসাগরে অবস্থিত। কিন্তু প্রচন্ড ঠান্ডা থাকায় বছরের চার মাস এটি বরফে ঢাকা থাকে। দেশটির অন্যান্য বন্দর গুলোরও একই অবস্থা।
ফলে ঐ কয়েকমাস দেশটির আমদানি রপ্তানি ব্যহত হয়। যা তাদের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। তাই রাশিয়ার একটি উষ্ণ পানির বন্দর প্রয়োজন।
অন্যদিকে ক্রিমিয়া অঞ্চলে অবস্থিত সেভাস্তোপোল বন্দর বরফে ঢাকা থাকে না। ফলে রাশিয়া এই বন্দর ব্যবহার করতে পারে।
শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কারনে ক্রিমিয়া গুরুত্বপূর্ণ, বিষয়টি এমন নয়। সোভিয়েত আমলে এই উপদ্বীপটি সোভিয়েত রাশিয়ার অংশ ছিল।
১৯৫৪ সালে নিকিতা ক্রুশ্চেভ এটি ইউক্রেনকে দিয়ে দেন। কিন্তু ইউক্রেনও সোভিয়েতের অংশ থাকায় বিনা বাঁধায় রাশিয়া সেভাস্তোপোল বন্দর ব্যবহার করতো।
দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ছিল সেখানে। কিন্তু ইউক্রেনের স্বাধীনতার পর বিষয়টি জটিল হয়ে দাঁড়ায়। দুই দেশের চুক্তি মোতাবেক শর্ত ছিলো, ২০৪২ সাল অবধি সেভাস্তোপোল বন্দর ব্যবহার করতে পারবে রাশিয়া।
কিন্তু ইউক্রেন বিভিন্ন সময় চুক্তি রিনিউ করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ বন্দরে রাশিয়ান সেনা থাকা তাদের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি।
ইউক্রেন ২০১৭ সালের পর আর চুক্তি রিনিউ করবে না বলে ঘোষণা দেয়। কিন্তু রাশিয়ার গ্যাস রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপের কারনে সিদ্ধান্ত বদলায় তারা। ২০৪২ সাল পর্যন্ত চুক্তি রিনিউ করে ইউক্রেন।
আবার তাতারদের সাথে বিরোধের কারণে সিরিয়া বন্দর ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায় রাশিয়ার। এর ফলে ক্রিমিয়ার সেভাস্তোপোল বন্দর আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে তাদের কাছে।
এসব কারণে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করেছিল রাশিয়া। কৃষ্ণ সাগর এবং ভূমধ্যসাগরে নিজেদের নৌ শক্তির আধিপত্য ধরে রাখতে ক্রিমিয়াকে প্রয়োজন তাদের।
সেভাস্তোপোল বন্দর, রাশিয়ার কৃষ্ণ সাগরে একমাত্র আশ্রয়। শুধু তাই নয়, পূর্ব ভূমধ্যসাগর, বলকান অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রবেশের চাবি কাঠি এটি।
একটি উষ্ণ পানির বন্দর ছাড়া রাশিয়ার নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যহত হবে। সেই সাথে গোটা বিশ্বে নিজেদের প্রভাব ক্ষুন্ন হবে৷ পরাশক্তির মর্যাদা ধরে রাখতেই উষ্ণ পানির বন্দর দরকার তাদের।
তাই ক্রিমিয়া রাশিয়ার প্রভাবমুক্ত হয়ে অন্য কারো দখলে গেলে- তা রাশিয়ার জন্য বিশাল বড় হুমকি।
দিন দিন ইউক্রেনের যুক্তরাষ্ট্র বা ন্যাটো প্রীতি বেড়েই চলেছিল।
ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিলে রাশিয়ার জন্য তা ভালো বিষয় নয়। রাশিয়া সীমান্তে ন্যাটো সৈন্য ঘুরাফেরা করলে সেটি দেশটির নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই ক্রিমিয়া নিজেদের অধীনে রাখতে চায় তারা।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মনে করেন, তিনি ক্রিমিয়া দখল করে একটি ঐতিহাসিক ভুল সংশোধন করেছেন। দেশটির জনগণ ক্রিমিয়াকে নিজেদের অংশ বলেই মনে করেন।
ক্রিমিয়ার বেশিরভাগ লোক রুশ ভাষায় কথা বলে। সাংষ্কৃতিক দিক থেকেও এই উপদ্বীপ রাশিয়ার মতোই। একটা সময় এই অঞ্চল থেকে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীতে সেনা সরবরাহ হতো।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিরিয়ে আনার স্বপ্নে বিভোর পুতিন। তাই দখল করে নেয়া ক্রিমিয়াকে কখনই হাত ছাড়া করতে চান না তিনি।
বর্তমানে চলমান রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ।
ইউক্রেনের দক্ষিণ ভাগে যুদ্ধরত সেনাদের রসদ, খাদ্য ও অস্ত্র সরবরাহ করা হয় ক্রিমিয়ার মধ্য দিয়ে।
ইউক্রেন ক্রিমিয়া দখল করতে মরিয়া।
কিন্তু ভ্লাদিমির পুতিন সংগত কারণে এই উপদ্বীপ কোনোভাবেই হাত ছাড়া করবেন না।
ক্রিমিয়া চলে গেলে বিশ্বে রাশিয়ার প্রভাব ও ভাবমূর্তি দুটোই ভেঙে পড়বে।